মেঘ গুড়গুড় বৃষ্টি : ফারুক হোসেন সজীব

Printed Edition
মেঘ গুড়গুড় বৃষ্টি : ফারুক হোসেন সজীব
মেঘ গুড়গুড় বৃষ্টি : ফারুক হোসেন সজীব

বর্ষার দিন। সকাল থেকেই আকাশে কালো মেঘ জমেছে। কখনো দূরে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। কখনো ঠাণ্ডা বাতাস এসে গাছের পাতা দুলিয়ে দিচ্ছে। গ্রামের মানুষ বুঝতে পারছিল, আজ বৃষ্টি হবে। মাঠের ধানগাছগুলো বাতাসে দুলছিল। পুকুরের পানি হালকা ঢেউ তুলে তীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ছোট্ট সোহান জানালার পাশে বসে আকাশ দেখছিল। বর্ষাকাল তার খুব প্রিয়। মেঘ জমলে তার মন ভালো হয়ে যায়। সে অপেক্ষা করছিল কখন বৃষ্টি নামবে। কিছুক্ষণ পর আকাশ থেকে ভেসে এলো গুড়গুড় শব্দ। তারপর আরো একবার। সোহান খুশি হয়ে বলল, বৃষ্টি আসছে! বৃষ্টি আসছে। ঠিক কিছুক্ষণ পরই টুপটাপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। প্রথমে অল্প। তারপর ধীরে ধীরে বৃষ্টি বেড়ে গেল। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ উঠল। উঠানের মাটি ভিজে গেল। আমগাছের পাতাগুলো ধুয়ে চকচক করতে লাগল। সোহানের দাদু বারান্দায় বসেছিলেন। তিনি মুচকি হেসে বললেন, বর্ষার বৃষ্টি গ্রামের জন্য আশীর্বাদ। এই পানি না হলে ফসল ভালো হয় না। সোহান দাদুর পাশে গিয়ে বসল। সে চুপচাপ বৃষ্টি দেখতে লাগল। পুকুরের ধারে কয়েকটি হাঁস আনন্দে সাঁতার কাটছে। সবকিছু দেখে তার খুব ভালো লাগল। এমন সময় সে দেখল, একটি ছোট্ট কুকুরছানা ভিজে কাঁপছে। সম্ভবত বৃষ্টির আগে কোথাও আশ্রয় নিতে পারেনি। কুকুরছানাটি একটি গাছের নিচে বসে ছিল। তার গা পুরো ভিজে গেছে। সোহানের মন খারাপ হয়ে গেল। সে দৌড়ে ঘরে গেল। একটি পুরনো শুকনো কাপড় নিয়ে এলো। তারপর কুকুরছানাটিকে আলতো করে কোলে তুলে বারান্দায় নিয়ে এলো। কাপড় দিয়ে তার শরীর মুছে দিলো। দাদু সব দেখছিলেন। তিনি বললেন, খুব ভালো কাজ করেছ। অসহায় প্রাণীদের সাহায্য করা ভালো মানুষের কাজ। সোহান হাসল। কুকুরছানাটিও যেন একটু স্বস্তি পেল। কিছুক্ষণ পর মা একটি ছোট বাটিতে দুধ এনে দিলেন। কুকুরছানাটি ধীরে ধীরে দুধ খেতে লাগল। বিকেলের দিকে বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশে এখনো মেঘ ছিল, তবে আগের মতো ঘন নয়। চারদিকে ধোয়া ধোয়া একটা সতেজ ভাব। গাছের পাতা ঝকঝক করছে। খালের পানি বেড়ে গেছে। মাঠগুলো আরো সবুজ দেখাচ্ছে। সোহান কুকুরছানাটিকে নিয়ে উঠানে হাঁটছিল। তখন গ্রামের কয়েকজন ছেলে তাকে দেখে বলল, নতুন বন্ধু পেয়েছ নাকি? সোহান হেসে মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ! বৃষ্টির দিনে ও আমার কাছে এসেছে। সবাই কুকুরছানাটিকে আদর করল। প্রাণীটিও আনন্দে লেজ নাড়াতে লাগল। সন্ধ্যার আগে আবার দূরে মেঘের গুড়গুড় শব্দ শোনা গেল। সোহান আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে হলো- বর্ষার দিনগুলো সত্যিই সুন্দর। শুধু বৃষ্টি দেখার জন্য নয়, মানুষের মনে দয়া আর ভালোবাসা জাগানোর জন্যও। রাতে দাদু বললেন, আজ তুমি একটি বড় শিক্ষা পেয়েছ। প্রকৃতিকে ভালোবাসার পাশাপাশি প্রাণীদের প্রতিও মমতা দেখাতে হয়। সোহান মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তার পাশে তখন ছোট্ট কুকুরছানাটি শান্ত হয়ে শুয়ে ছিল। বাইরে আবার মেঘ গুড়গুড় করে উঠল। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি নামল। টুপটাপ শব্দে চারদিক ভরে গেল। সোহান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে লাগল। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। কারণ সে জানত, এই বৃষ্টির দিনে সে একটি নতুন বন্ধু পেয়েছে, আর একটি ভালো কাজও করতে পেরেছে। সেদিনের পর থেকে গ্রামের সবাই কুকুরছানাটিকে চিনত। আর সোহান যখনই আকাশে মেঘের গুড়গুড় শব্দ শুনত, তার সেই বর্ষার দিনের কথা মনে পড়ে যেত। সেই দিন, যেদিন বৃষ্টির সাথে সাথে তার হৃদয়ও একটু বেশি ভালোবাসায় ভরে উঠেছিল!