ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দরজায় কড়া নেড়েছেন প্রায় অর্ধশত পরাজিত প্রার্থী। একে একে জমা পড়া মামলার সংখ্যা এখন পাহাড়সম, যেখানে বাদি হিসেবে রয়েছেন দেশের রাজনীতির শীর্ষস্থানীয় ও হেভিওয়েট সব নাম। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাওলানা মামুনুল হক, বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী এম এ কাইয়ুম ও হাবিবুর রহমান হাবিবের মতো প্রার্থীরা এখন আদালতের বারান্দায় আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বিচারপতি মো: জাকির হোসেনের নেতৃত্বাধীন একক বেঞ্চ ইতোমধ্যে এসব মামলা শুনানির জন্য গ্রহণ করে বিবাদিদের প্রতি কারণদর্শানোর নোটিশ ইস্যু করেছেন। আদালতের কঠোর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, চ্যালেঞ্জ করা আসনগুলোর ব্যালট পেপার ও রেজাল্ট শিট নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অবিলম্বে নিজেদের বিশেষ হেফাজতে নিতে হবে, যাতে প্রয়োজনে যেকোনো সময় পুনর্গণনা বা যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয়।
নির্বাচনী মামলার এই বিশাল স্তূপ ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ মো: খসরুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। সংবিধানে জনগণের ভোটাধিকারের যে নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে, কারচুপির মাধ্যমে তা ক্ষুণœ হলে এই পিটিশনগুলোই আইনি প্রতিকারের একমাত্র পথ। তবে বাস্তবতা হলো, সাধারণ দেওয়ানি মামলার মতো এখানেও দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় অন্তরায়। যদি হাইকোর্ট বিভাগ বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে এই মামলাগুলোর শুনানি দ্রুত শেষ না করে, তবে সশরীরে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সব নথিপত্র অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করা, কারণ কারচুপি প্রমাণের মূলভিত্তি হলো এই ব্যালট পেপার ও রেজাল্ট শিটগুলো। দ্রুত বিচারের মাধ্যমে জনমনে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো ‘কুইক ডিসপোজাল অব কেসেস’ বা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি। আইনত মামলাগুলো দ্রুত শেষ করার কথা থাকলেও এর বাস্তবায়নের জন্য প্রধান বিচারপতির সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি যদি সংশ্লিষ্ট বিচারকদের এই মর্মে নির্দেশনা প্রদান করেন যে নির্বাচনসংক্রান্ত মামলাগুলো তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে, তবেই প্রার্থীরা সুফল পাবেন। তা না হলে দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলা কেবল মামলার জায়গাতেই পড়ে থাকবে, বাস্তবে কোনো ফল আসবে না।
এই আইনি লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘অতীতে আমরা দেখেছি এই মামলাগুলো খুব ধীরগতিতে এগোয়। একটি দেওয়ানি মামলা যেভাবে পরিচালিত হয়, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোও একই পদ্ধতিতে চলে। মামলা ফাইল ও গ্রহণের পর নোটিশ যায়, অপরপক্ষ আসে, ইস্যু ফ্রেম হয়, সাক্ষ্য-প্রমাণ আসে, জেরা ও যুক্তিতর্ক হয়, ডকুমেন্টগুলো এক্সিবিট হয় এবং সবশেষে রায় হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষ করতে অনেক সময় তিন থেকে পাঁচ বছর লেগে যায়। অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, দুই-একটি মামলায় সফলতা এলেও সেটি এমন সময় আসে যখন পার্লামেন্টের মেয়াদই থাকে না। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, এসব দীর্ঘসূত্রতা থেকে বাঁচতে হলে একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। প্রতিদিন ট্রাইব্যুনাল বসতে হবে এবং একটি মামলা ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করে আরেকটিতে যেতে হবে। একটি ট্রাইব্যুনালের পক্ষে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করলেও অর্ধশতাধিক পিটিশন সুরাহা করা সম্ভব নয়। ট্রাইব্যুনালগুলোকে এই কাজ ছাড়া অন্য কোনো দায়িত্ব দেয়া যাবে না; এটাই এখানে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার জায়গা।
একই বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, এই মামলাগুলো সম্পর্কে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার এত বিলম্বিত হয় যে, একটা পর্যায়ে প্রার্থী আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। সাক্ষীদের পাওয়া যায় না। অনেক সময় দেখা যায়, একটি নির্বাচন থেকে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত সময় শুধু মামলা নিষ্পত্তিতেই লেগে যায়। এ কারণে অনেকে মনে করেন, এসব মামলার সাকসেস রেট (সাফল্যের হার) কম হওয়ায় এগুলোর কোনো অর্থ নেই।
তিনি আরো বলেন, আগে এটি তিন স্তরবিশিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ছিল, যা এখন দুই স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ মামলাগুলো সরাসরি হাইকোর্টে দায়ের করতে হবে এবং হাইকোর্টের রায়ে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাবেন। এই মামলাগুলো নিষ্পত্তির মূল তাগিদ থাকে বাদির ওপর। বাদি এবং তার নিয়োগকৃত আইনজীবী কতটা সক্রিয়ভাবে মামলা পরিচালনা করবেন এবং কত দ্রুত সাক্ষ্য উপস্থাপন করবেন, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। অন্য দিকে, যিনি ইতোমধ্যে এমপি হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন, তার চেষ্টা থাকবে মামলাটি বিলম্বিত করার। হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতেই কেউ সরাসরি পার্লামেন্টে গিয়ে বসবেন এমনটি মনে করার কারণ নেই। কারণ যিনি সংক্ষুব্ধ হবেন, তিনি অবশ্যই সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবেন এবং সেটিও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এসব মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে শুধু আইনজীবীদের চেষ্টা থাকলেই হবে না; বেঞ্চ গঠন এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতিরও ভূমিকা রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ব্যারিস্টার এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী মনে করেন, ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী প্রার্থীদের এই অধিকার থাকলেও আইনি মারপ্যাঁচে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। মামলাগুলো দেওয়ানি প্রকৃতির হওয়ায় দেওয়ানি কার্যবিধি এবং আরপিও গাইডলাইনস অনুসরণ করা হয়। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় একটি সংসদের মেয়াদ চলাকালীন জাতীয় নির্বাচনের ইলেকশন পিটিশন নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা একদমই নেই বললে চলে। হাইকোর্ট বিভাগ রায় দিলেও তার বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকায় নির্বাচন কমিশন তা দ্রুত কার্যকর করতে পারে না। তবে রিটকারীরা দ্রুত নিষ্পত্তি চাইলে আদালতে আবেদন করতে পারেন এবং আদালত গুরুত্ব বিবেচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।
মামলার নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতারাই এই আইনি লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকায়। বিএনপির ২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন মাদারীপুরের নাদিরা আক্তার, নীলফামারীর শাহরিন ইসলাম, চুয়াডাঙ্গার মো: শরীফুজ্জামান, কুষ্টিয়ার সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, ঢাকার মো: নবী উল্লাহ, গাইবান্ধার মো: ফারুক আলম, পাবনার মো: হাসান জাফির তুহিন, সিরাজগঞ্জের আকবর আলী, কুমিল্লার কামরুল হুদা, ঢাকার তানভীর আহমেদ রবিন, কুড়িগ্রামের সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, রংপুরের সাইফুল ইসলাম ও এমদাদুল হক ভরসা, রাজশাহীর মে. জে. (অব:) মো: শরীফউদ্দিন ও ডিএমডি জিয়াউর রহমান, শেরপুরের সানসিলা জেবরিন এবং ময়মনসিংহের সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স, মোতাহার হোসেন তালুকদার ও মো: আখতারুল আলমসহ অন্যরা।
অন্য দিকে জামায়াতের ২০ জন প্রার্থীর তালিকায় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ছাড়াও রয়েছেন হামিদুর রহমান আজাদ, পিরোজপুরের শামীম সাঈদী, বরগুনার ডা: সুলতান আহম্মেদ, নারায়ণগঞ্জের ইলিয়াছ মোল্লা ও ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া, লালমনিরহাটের আনোয়ারুল ইসলাম রাজু ও ফিরোজ হায়দার, ঢাকার আব্দুল মান্নান, মো. এনায়েতউল্লাহ ও জসিমউদ্দিন সরকার, গাইবান্ধার মো. আব্দুর রহিম সরকার এবং কক্সবাজারের নূর আহম্মেদ আনোয়ারীসহ অন্যরা। এমনকি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক এবং এলডিপির কর্নেল (অব:) অলি আহম্মেদের পক্ষে তার ছেলে ওমর ফারুকও আইনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। এই আইনি লড়াই কেবল কাগুজে যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকে নাকি প্রকৃত অর্থে ভোটারদের রায়ের প্রতিফলন ঘটায়, তা সময়ই বলে দেবে।



