রিয়েল এস্টেটে নেয়া যাবে না নামজারি অনুমোদন ফি

নতুন প্রজ্ঞাপন জারি : ডেভেলপারদের অর্থ আদায় বন্ধে কঠোর নির্দেশ

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

রিয়েল এস্টেট খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা ‘নামজারি অনুমোদন’ ও ‘বিক্রয় অনুমোদন ফি’-এর নামে অর্থ আদায়ের বিষয়টি অবশেষে বেআইনি ঘোষণা করেছে সরকার। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গতকাল বুধবার (১২ নভেম্বর) এক প্রজ্ঞাপনে জানিয়েছেÑ কোনো ডেভেলপার বা রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ফ্ল্যাট বা জমির পরবর্তী হস্তান্তর, বিক্রয়, বা নামজারির সময় ক্রেতা-বিক্রেতার কাছ থেকে কোনো অর্থ আদায় করতে পারবে না।

প্রজ্ঞাপনের মূল বিষয়বস্তু : প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে- ‘রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার কর্তৃক সাফ কবলা দলিলমূলে বিক্রীত ও হস্তান্তরিত ভূমি অথবা ফ্ল্যাট পরবর্তীতে পুনঃবিক্রয় বা হস্তান্তরের সময় বিক্রয়, হস্তান্তর বা নামজারির অনুমোদনের নামে ক্রেতাদের হয়রানি এবং অর্থ আদায় সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত।’

এ অবস্থায় কোনো ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান যদি এই নির্দেশ অমান্য করে, তাদের বিরুদ্ধে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এবং রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১১-এর আওতায় কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রজ্ঞাপনটি রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করেছেন উপসচিব ড. মো: নুরুল আমিন। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়।

দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি : রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে দীর্ঘদিন ধরে ফ্ল্যাট বা প্লট ক্রেতাদের অভিযোগ ছিল- ডেভেলপার কোম্পানিগুলো পুনঃবিক্রয় বা হস্তান্তরের সময় ‘অনুমোদন ফি’ বা ‘ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট ফি’ নামে কয়েক হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে। এতে সাধারণ ক্রেতারা আইনি জটিলতা ও আর্থিক ভোগান্তির শিকার হতেন।

নির্মাণশিল্প সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত আবাসন খাতের স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং ক্রেতা সুরক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

নীতিগত দিক ও আইনি প্রভাব : আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের অর্থ আদায় কোনোভাবেই ‘বিক্রয়-পরবর্তী মালিকানার স্বাধীনতা’ সীমিত করতে পারে না।

সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, ‘একবার ফ্ল্যাট বা জমি সাফ কবলা দলিলের মাধ্যমে হস্তান্তর হলে, ক্রেতাই তার একমাত্র মালিক। ডেভেলপারের অনুমোদনের শর্ত আরোপ করা বা অর্থ নেয়া আইনি ভিত্তিহীন।’

তিনি মনে করেন, এই প্রজ্ঞাপন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ‘রিয়েল এস্টেট বাজারে একচেটিয়া দখলদারিত্ব’ অনেকটাই হ্রাস পাবে।

সরকারি তদারকি জোরদারের ইঙ্গিত : গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে রাজউক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (কেডিএ) এ বিষয়ে নির্দেশ পাঠিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ক্রেতা হয়রানির অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

নীতিগত তাৎপর্য ও জুলাই-পরবর্তী সংস্কার প্রেক্ষাপট : ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এই প্রজ্ঞাপন সেই ধারাবাহিক নীতিরই অংশ, যার মূল লক্ষ্য হলো জনসাধারণের ভোগান্তি কমানো এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের ন্যায়সঙ্গত পরিবেশ তৈরি করা।

রিয়েল এস্টেট খাতে দীর্ঘদিন ধরে ডেভেলপারদের একটি অংশ ‘নামজারি অনুমোদন ফি’ ও ‘বিক্রয় অনুমোদন সার্টিফিকেট’-এর নামে অননুমোদিত অর্থ আদায় করে আসছিল। এসব অর্থ আদায়ের কোনো সরকারি অনুমোদন ছিল না, তবুও অনেকে তা ‘অঘোষিত ব্যবসায়িক রেওয়াজ’ হিসেবে চালু রেখেছিল। সরকার এবার এই প্রথাকে আইনের মাধ্যমে বন্ধ করল।

জুলাই সনদের আলোকে প্রশাসনিক সংস্কার: জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত ‘প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জনসেবার জবাবদিহিতা’ অধ্যায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছিলÑ ‘জনগণের সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেনে অপ্রকাশ্য ফি, ঘুষ বা দালালি সংস্কৃতি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হবে।’

এই প্রজ্ঞাপনকে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করল যে, রিয়েল এস্টেট ডেভেলপাররা ক্রেতা বা বিক্রেতার ওপর কোনো অনুমোদন ফি আরোপ করতে পারবে না। এটি শুধু অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার দিক থেকে নয়, প্রশাসনিক আস্থার পুনর্গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ।

খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া : বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের (রিহ্যাব) একজন পরিচালক বলেন, ‘আমরা নীতিমালা মেনে ব্যবসা করতে চাই। তবে বাস্তবে অনেক ছোট কোম্পানি এই ফি আদায়কে রেওয়াজে পরিণত করেছিল। সরকার এখন পরিষ্কারভাবে বলায় বাজারে ইতিবাচক বার্তা যাবে।’

এই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আবাসন খাতের ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে আইনভিত্তিক আস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি প্রশাসনিকভাবে সঠিকভাবে তদারকি করা যায়, তবে এটি ডেভেলপারদের অনৈতিক চাঁদাবাজি বন্ধে একটি মাইলফলক সিদ্ধান্ত হয়ে উঠবে।