পদত্যাগ করেছেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার বিকেলে ‘অসুস্থতার কারণ’ দেখিয়ে তিনি স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তার পদত্যাগে’ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বিকেলে জাতীয় সংসদে সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কথা জানান। স্পিকার বলেন, তিনি গুরুতর অসুস্থ। বিভিন্ন রোগের কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালনে অসামর্থ্য হওয়ায় পদত্যাগ করেছেন। এ দিকে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। আর স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
মো: সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায়। ওই সময় শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। এরপর সংসদ ভেঙে দেয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো: সাহাবুদ্দিন। গণ-অভ্যুত্থানের পর তার অপসারণ চেয়েছিলেন ছাত্রনেতারা। সে দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিল জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন। তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে সরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পরবর্তী সময়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পটভূমিতে ভিন্নতা তৈরি হয়। মো: সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রপতি হলেও বিএনপি তাকে সাথে সাথে সরানোর পথে যায়নি। পটপরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল। তবে সরকার বা বিএনপি প্রকাশ্যে কখনো তার পদত্যাগ দাবি করেনি।
মো: সাহাবুদ্দিন অতীতে একাধিকবার প্রকাশ্যে পদত্যাগের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি বলেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে অপমানিত বোধ করছেন এবং জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হলে দায়িত্ব ছেড়ে দিতে চান। পরে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সরকার চাইলে তিনি পদ বহাল রাখবেন, আর প্রয়োজন মনে না করলে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াবেন।
পদত্যাগপত্রে যা লিখলেন : রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগপত্রে বলেছেন, ‘আমি মো: সাহাবুদ্দিন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ খ্রি. সনের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করি এবং অদ্যাবধি নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সাথে দায়িত্ব পালন করছি। উল্লেখ্য যে, ৫ আগস্ট ২০২৪ সনে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। সাংবিধানিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়ে সরকার পরিচালনা করছে। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।
পত্রে তিনি বলেন, আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন। এমতাবস্থায়, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করছি।’
আলোচনায় ফোনালাপসহ যা রয়েছে : হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর থেকেই সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবি চলে আসছিল। তবে সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, গত মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সাথে ফোনে কথা বলেছেন মো: সাহাবুদ্দিন। এরপরই মূলত রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন উঠে। এই ঘটনায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক আস্থার জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের বিভিন্ন মহলেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে পদত্যাগের পেছনে ‘ফোনালাপে’র অভিযোগের পাশাপাশি আরো বিস্তৃত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিবেচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন, আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনসংক্রান্ত আলোচনা, নিষিদ্ধ ঘোষিত দল ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের চলমান কঠোর অভিযান এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবেলায় অবস্থান- সব মিলিয়ে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে মনে করে সরকার।
কয়েক দিন ধরে আলোচনার মধ্যে বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে বলেন, শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। লন্ডনে শেখ হাসিনার সাথে কথা বলেছেন বলে প্রকাশিত খবর নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, এ বিষয়ে তাদের কিছু জানা নেই। পরে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয় থাইল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার দেশে ফিরছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই তিনি ব্যাংককে গিয়েছিলেন। সফরসূচি অনুযায়ী রোববার তার ফেরার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগে তিনি দেশে ফেরেন। তার ফেরার খবরেই মূলত সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়টি জোরালো হয়।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে স্পিকার :
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ১২৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে দলটির মনোনীত ব্যক্তিরই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মো: সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে, তা নিয়ে বিএনপির শীর্ষপর্যায়ে কয়েক দিন ধরে আলোচনা চলছে।
যেসব সুবিধা পাবেন সাহাবুদ্দিন : পদত্যাগ করলেও আমৃত্যু বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন সদ্য সাবেক এ রাষ্ট্রপতি। দেশের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে মেয়াদ শেষ করেছেন কিংবা কমপক্ষে ছয় মাস দায়িত্ব পালন করেছেন- এমন ব্যক্তি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রতি মাসে সর্বশেষ যে বেতন পেতেন, তার ৭৫ শতাংশ হারে মাসিক অবসরভাতা পাবেন।
দি প্রেসিডেন্টস (রেমিউনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) অ্যাক্ট, ১৯৭৫ (মে ২০১৬ পর্যন্ত সংশোধিত) এ রাষ্ট্রপতির অবসরভাতা ছাড়াও বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধার কথা উল্লেখ রয়েছে। আইন অনুযায়ী, একজন ব্যক্তিগত সহকারী ও একজন অ্যাটেনডেন্ট পাবেন। দাফতরিক ব্যয়ও পাবেন। যার মোট বাৎসরিক পরিমাণ সরকার নির্ধারণ করবে।
পাশাপাশি সরকারি অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য বিনামূল্যে সরকারি যানবাহন ব্যবহার, আবাসস্থলে একটি টেলিফোন সংযোগ এবং সরকার নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত এর বিল পরিশোধ থেকে অব্যাহতি পাবেন। এ ছাড়া একজন মন্ত্রীর প্রাপ্য চিকিৎসা সুবিধার সমপরিমাণ চিকিৎসা সুবিধাদি, একটি কূটনৈতিক পাসপোর্টও পাবেন তিনি। আর দেশের ভেতর ভ্রমণকালে সরকারি সার্কিট হাউজ বা রেস্ট হাউজে বিনা ভাড়ায় অবস্থানের সুবিধা পাবেন।
যে বাসায় উঠতে পারেন : গুলশানের ১২৩ নম্বর রোডের ‘গ্রিন ভিলায়’ উঠতে পারেন মো: সাহাবুদ্দিন। সরেজমিনে যেখানে বঙ্গভবন ছাড়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যকে দেখা গেছে। গুলশানের এ বাসায় টেলিফোন লাইনের গতকাল সংযোগ দিতে আসেন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্সের কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) দুইজন কর্মচারী।
এ বাসার পঞ্চম তলায় রাষ্ট্রপতির ওঠার কথা হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছেন বাসার নিরাপত্তা প্রহরী মো: মাছুম। তিনি বলেন, তিন-চারদিন আগে স্যার এসেছিলেন এ বাসায়। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় শতাধিক লোকজন এসেছিল। ইতোমধ্যে তার বাসায় টুকিটাকি বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এখানে এসবির (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) কয়েকজন লোক রয়েছেন।
বিটিসিএলের টিসিএম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মূলত সরকারিভাবে আমরা এখানে নতুন টেলিফোন লাইন লাগাতে এসেছি, আজকে (শুক্রবার) যদিও বন্ধ, তবু বলা হয়েছে, উনি পদত্যাগ করলে এ বাসাতেই উঠবেন। এর আগের যে লাইন ছিল, সেটি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বাদ দেয়া হয়েছে। তাই এখন নতুন লাইন লাগাতে এসেছি।



