১০ লাখ গাজাবাসীকে লিবিয়ায় স্থানান্তরের পরিকল্পনা ট্রাম্পের

ইসরাইলি হামলায় ৪৮ ঘণ্টায় ৩০০ ফিলিস্তিনি নিহত

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

দখলদার ইসরাইলি সেনাবাহিনী অবরুদ্ধ ও বোমাবর্ষণে বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় ‘অপারেশন গিডিয়ন্স চ্যারিওটস’ নামে নতুন অভিযান শুরুর পর গত ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ৩০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। গতকাল শনিবার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, ইসরাইলের সর্বশেষ আক্রমণের অংশ হিসেবে শুধু গত ২৪ ঘণ্টাতেই প্রায় ১৫০ জন নিহত হয়েছেন।

মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় নিহত ১৫৩ জনের লাশ গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সাতজনের লাশ পূর্বের হামলায় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে আরো ৪৫৯ জন আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫৩ হাজার ২৭২ জন নিহত এবং এক লাখ ২০ হাজার ৬৭৩ জন আহত হয়েছেন।

এই মৃত্যু ও ধ্বংসের মাত্রা ইসরাইলের নতুন সামরিক অভিযানের প্রাথমিক পর্যায়েই কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। ইসরাইলের ‘অপারেশন গিডিয়ন্স চ্যারিওটস’ নামে এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য গাজার কৌশলগত এলাকার দখল নেয়া।

অন্য দিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা থেকে ১০ লাখ ফিলিস্তিনিকে স্থায়ীভাবে লিবিয়ায় পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনে গোপনে আলোচিত এই পরিকল্পনাটি বর্তমানে যথেষ্ট গুর”ত্ব সহকারে বিবেচনাধীন রয়েছে।

এ দিকে গতকাল শনিবার বাগদাদে আরব লীগ শীর্ষ সম্মেলনে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের প্রাণঘাতী অভিযান ঘোষণার পর গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস।

গাজাবাসীকে লিবিয়ায় স্থানান্তর : মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ১০ লাখ ফিলিস্তিনিকে স্থায়ীভাবে লিবিয়ায় পুনর্বাসনের পরিকল্পনার সাথে সরাসরি যুক্ত দুই ব্যক্তি এবং একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই লিবিয়ার নেতৃত্বের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাদের মতে, এটি নিছক ধারণা নয়, বরং কূটনৈতিক স্তরে এর বাস্তবায়ন নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই পুনর্বাসনের প্রস্তাবনার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়াকে দীর্ঘ দিন আগে জব্দ করে রাখা কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করে দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। এসব তহবিল এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হিমায়িত অবস্থায় রয়েছে। এই আর্থিক সুবিধার বিনিময়েই ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের লিবিয়ায় গ্রহণে সম্মত হওয়ার কথা লিবিয়ার নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।

মার্কিন এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হলে এটি মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার ভূ-রাজনৈতিক চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। ফিলিস্তিনি জনগণের ভবিষ্যৎ, গাজার স্থিতিশীলতা এবং লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা- এই তিনটি বিষয়ই এই পরিকল্পনার বাস্তবতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

যুক্তরাষ্ট্র বা লিবিয়ার সরকার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, ফিলিস্তিনিদের এমনভাবে স্থানান্তর একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এটি তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার হরণ করবে। এই পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ কী হবে তা সময়ই বলবে, তবে একে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিতর্ক ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

চাপ প্রয়োগের আহ্বান সিসির : বার্তা সংস্থা এএফপির খবর অনুসারে, গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রয়োজনীয় চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। বাগদাদ থেকে এএফপি জানায়, গতকাল শনিবার বাগদাদে আরব লিগ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যে সিসি বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানাই, একজন শান্তি প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী নেতা হিসেবে তিনি যেন গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতির জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা ও চাপ প্রয়োগ করেন।’ তিনি বলেন, এটি হবে ‘একটি বাস্তব রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা, যেখানে তিনিই হবেন মধ্যস্থতাকারী ও উদ্যোগের পৃষ্ঠপোষক।’

যুদ্ধবিরতির আলোচনা : বার্তা সংস্থা রয়টার্স হামাস কর্মকর্তা তাহের আল-নোনোর উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে, যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা কাতারে বর্তমানে ইসরাইলের সাথে গাজা যুদ্ধবিরতি আলোচনার একটি নতুন দফা চলছে। সংবাদ সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুসারে, আল-নোনো বলেছেন যে দোহায় উভয়পক্ষই ‘পূর্ব-শর্ত’ ছাড়াই সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে।