কুমিল্লা প্রতিনিধি
কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গত শনিবার রাতে ২টা ৫৫ মিনিটে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নোয়াখালীর দিকে যাওয়ার পথে মামুন পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাসের সাথে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনা স্থলেই ১২ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় অন্তত ১৫ জন। তাদেরকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছিল।
নিহতদের ৭ জন পুরুষ, ২ জন নারী ও তিনটি শিশু রয়েছে। ময়নামতি হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: আব্দুল মোমিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
নিহতরা হলেন- নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার সালামত উল্লাহর ছেলে মো: বাবুল চৌধুরী (৫৩), সুধারাম থানার মো: সেলিমের ছেলে নজরুল ইসলাম রায়হান (৩৩), চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার মোমিনুল হকের ছেলে তাজুল ইসলাম (৬৮), লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মো: সিরাজুল দৌলার মেয়ে সায়েদা (৯), ঝিনাইদহের মহেশপুরের পিন্টুর মেয়ে লাইজু আক্তার (২৬), খাদিজা আক্তার (৬) ও মরিয়ম আক্তার (৪) সদর উপজেলার মো: মোকতার বিশ্বাসের ছেলে মো: জোয়াদ বিশ্বাস (২০), মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলার ওহাব শেখের ছেলে ফসিয়ার রহমান (২৬), চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের বিল্লাল হোসেনের ছেলে সোহেল রানা (৪৬), যশোরের চৌগাছার ফকির চাঁদ বিশ্বাসের ছেলে মো: সিরাজুল ইসলাম (৬২) ও একই এলাকার সিরাজুল ইসলামের স্ত্রী কোহিনূর বেগম (৫৫)। ঘটনাস্থলে তদন্তে আসা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক পরিদর্শক জানান, আহতদের বক্তব্য ও প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে ঘটনার সময় গেটম্যান গেট ফেলেননি। রাস্তা ফাঁকা পেয়ে বাসটি রেললাইনে উঠে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই রেলক্রসিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত গেটম্যান পালিয়ে যান। কর্তব্যে অবহেলার দায়ে রেলওয়ের দুই গেটম্যান মেহেদি হাসান ও হেলাল উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সকাল ৮টার দিকে আখাউড়া থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন এসে কাজ শুরু করে এবং বেলা ১১টার পর ওই রুটে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
প্রধানমন্ত্রীর শোক প্রকাশ : কুমিল্লার এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের সাথে কথা বলে তিনি আহতদের সুচিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতার জন্য দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জামায়াত আমিরের : কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় সংসদ নেতা ডা: শফিকুর রহমান।
রোববার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।
পোস্টে তিনি লেখেন, কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন এবং ফেনীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় আরো তিনজনের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনায় আমি গভীরভাবে শোকাহত। নিহতদের পরিবারগুলোর শোক কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। নিহত সবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।
জামায়াতের আমির বলেন, এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো আবারো প্রমাণ করে, আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা, সড়ক ও রেলপথের নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতার ঘাটতি কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
পোস্টে তিনি আরো লিখেন, আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি- দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনুন।
২ গেটম্যানকে আসামি করে মামলা : সোমবার কুমিল্লায় ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে ১২ জন নিহতের ঘটনায় গেটম্যান হেলাল উদ্দিন ও ওয়েম্যান মেহেদী হাসানকে আসামি করে লাকসাম রেলওয়ে থানায় মামলা করেছেন আহত বাসযাত্রী শেফালী আক্তার। শেফালী আক্তার দুর্ঘটনায় নিহত সোহেল রানার খালা। তার বাড়ি কুমিল্লার লাকসামে। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে লাকসাম রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ জসীম উদ্দিন জানান, বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ‘দায়িত্বে অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু’ সংক্রান্ত ৩০৪ (ক) ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। মামলার বাদি নিহত সোহেল রানার খালা শেফালী আক্তার, যিনি নিজেও ওই বাসে ছিলেন।
অফিসার ইনচার্জ জসীম উদ্দিন আরও জানান, মালয়েশিয়া প্রবাসী সোহেল রানা ঈদ করতে চুয়াডাঙ্গার নিজ বাড়িতে আসেন। সেখান থেকে ঈদের দিন কুমিল্লার লাকসামে খালার বাড়িতে বেড়াতে আসার পথে পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিংয়ে এই দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন। একই ঘটনায় আহত তার স্ত্রী ও মেয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
৩টি তদন্ত কমিটি গঠন : রোববার সকালে ঘটনাস্থলে যান কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু: রেজা হাসান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা জেলা প্রশাসন থেকে নিহতদের জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা সহায়তা করবো।’
জেলা প্রশাসক বলেন, দুর্ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন ও রেলওয়ে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে । অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো: জাফর সাদিক চৌধুরীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন।
রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিভাগীয় ও জোনাল আরও দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কার অবহেলায় এ দুর্ঘটনা তা তদন্তের পর বলা যাবে।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রীর ঘটনাস্থল পরিদর্শন : কুমিল্লার সদর দক্ষিণে যাত্রীবাহী বাস ও ট্রেন সংঘর্ষে ১২ জন নিহতের ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে আহতদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ।
এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ইতোমধ্যে রেল দুর্ঘটনায় দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।
কিভাবে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করা যায়, সে জন্য রেলক্রসিংকে আধুনিকায়ন করা যায় এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত রয়েছে বলেও তিনি জানান।
এ সময় কৃষিমন্ত্রী, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিন , কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু, কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মো: মোস্তাক মিয়া, কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসানসহ রেলওয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নিহতদের পরিবারকে ১ লাখ টাকা প্রদানের ঘোষণা : রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ঘোষণা দেন নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে রেলওয়ের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথেও কথা বলেছেন বলে জানান।
লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর দায়িত্ব নিলো জামায়াত : অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়িতে নিহতদের লাশ বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিলো কুমিল্লা মহানগর জামায়াত। আহতদের চিকিৎসা এবং নিহতদের লাশ পৌঁছানো সার্বিক তদারকির জন্য কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি কামরুজ্জামান সোহেলকে প্রধান করে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করে। কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আহত ও নিহতদের দেখতে যান জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাছুম, কুমিল্লা মহানগর আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, কুমিল্লা মহানগর সেক্রেটারি মাওলানা মাহবুবুর রহমানসহ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা।
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা: মো: শাহজাহান জানান, দুর্ঘটনায় নিহত ১২ জনের লাশ হাসপাতালে আনা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় সবার পরিচয় শনাক্ত করার পর রোববার স্বজনদের কাছে তা হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে।



