ফতুল্লায় বিএনপির দুই গ্রুপে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, মাদরাসা ছাত্রসহ গুলিবিদ্ধ ৩

Printed Edition
নারায়ণগঞ্জে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত একজন (ইনসেটে)  : নয়া দিগন্ত
নারায়ণগঞ্জে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত একজন (ইনসেটে) : নয়া দিগন্ত

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি ও ফতুল্লা সংবাদদাতা

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার এনায়েত নগরে গার্মেন্টের ঝুট (ওয়েস্টেজ মালামাল) নামানোকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে এক মাদরাসার ছাত্রসহ ৩জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আহতরা হলেন, ফতুল্লার এনায়েতনগর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খোকা মিয়ার ছেলে রাকিব (২২), মাদরাসা ছাত্র ইমরান হোসেন (১২) ও রফিক (৪০)।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফতুল্লা মডেল থানার এনায়েত নগর শাসনগাঁও চাঁদনী হাউজিং এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, চাঁদনী হাউজিং এলাকায় অবস্থিত ‘ডয়েজল্যান্ড’ নামের একটি পোশাক কারখানার ওয়েস্টেজ মালামাল নামানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির একটি গ্রুপের সাথে যুবদলের অভি-মনির গ্রুপের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় অভি-মনির অনুসারীরা হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং গুলিবর্ষণ করে। এতে রাকিব ও পথচারী ইমরান হোসেন গুলিবিদ্ধ হন এবং ককটেল ও ধারালো চাপাতির আঘাতে রফিক আহত হন। সংঘর্ষে খোকা-মাসুদ গ্রুপের রাকিব এবং পথচারী মাদরাসাছাত্র ইমরান হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বাসিন্দারা ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে আতঙ্কে অবস্থান নেন।

এ সময় পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাদরাসাছাত্র ইমরান কিছু সময় রাস্তায় পড়ে কাতরাতে থাকে। পরে স্থানীয়রা তাকে ও রাকিবকে উদ্ধার করে প্রথমে খানপুর ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।

প্রত্যদর্শীরা জানান, সংঘর্ষ চলাকালে অভি গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এ সময় এনায়েতনগর ইউনিয়ন ১নং ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো: হোসেন খোকার ছেলে রাকিব গুলিবিদ্ধ হন।

গুলিবিদ্ধ মাদরাসার ছাত্র ইমরানের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন তার বাবা আসমাউল হোসেন। তিনি জানান, ইমরানের বুকের নিচের অংশে গুলি লেগে প্রচণ্ড রক্তরণ হয়েছে এবং জরুরি রক্তের প্রয়োজন।

চাঁদনী হাউজিং এলাকার বাসিন্দারা জানান, সংঘর্ষের সময় অস্ত্রের মহড়া ও গোলাগুলিতে পুরো এলাকা রণেেত্র পরিণত হয়। জীবন রায় সাধারণ মানুষ ছোটাছুটি শুরু করেন এবং ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে দেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চাদনী হাউজিং এলাকার বেস্ট স্টাইল কম্পোজিট লিমিটেডের ঝুট নামাতেন জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনির অনুসারীরা। এ নিয়ে ফতুল্লা থানা যুবদলের আহ্বায়ক মাসুদুর রহমান ও তার অনুসারীদের সাথে বিরোধ চলছিল। ওই বিরোধের জেল ধরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এনায়েত নগর ইউনিয়ন ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো: হোসেন খোকা জানান, ফতুল্লা থানা যুবদলের আহ্বায়ক হাজী মাসুদুর রহমান মাসুদের নেতৃত্বে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে আগে থেকে অবস্থান নেয়া রনির অনুসারী অভি, মনির, সুমন, জসিমসহ ২০-৩০ জন তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলে তিনি দাবি করেন।

জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি দাবি করেন, কারখানাটি থেকে বৃহস্পতিবার ঝুট নামানোর কথা ছিল। কারখানা থেকে যারা বৈধভাবে ঝুট নামাচ্ছিলেন তাদের উপর হামলা হয়েছে। তবে ঘটনা কোন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়। পুরোটাই ব্যবসায়িক এতে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক সার্কেল) হাসিনুজ্জামান জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ওয়েস্টেজ মালামাল নিয়ে বিরোধ থেকেই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন ফতুল্লায় ঝুট ব্যবসা নিয়ে বিএনপির দুই পরে সংঘর্ষ এবং শিশুসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক আইডিতে দেয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিভিন্ন অভিযোগ করেন।

স্ট্যাটাসে অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, ফতুল্লায় সরকারি দলের পরিচয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা ও খুনাখুনি ঠেকাতে প্রশাসনের তেমন তৎপরতা দেখা যায় না। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পরিচয়ে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বারবার অনুরোধ করা হলেও প্রশাসন এ বিষয়ে উদাসীন ভূমিকা পালন করছে।

তিনি আরো বলেন, ঝুট ব্যবসা সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কেউ আইনি পদপে নিতে গেলে থানা থেকে উল্টো আপস-মীমাংসার প্রস্তাব দেয়া হয়। চিহ্নিত চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও বৈষম্যবিরোধী হত্যামামলার আসামিদের প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আশপাশে দেখা যায়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

এমপি আল আমিন সতর্ক করে বলেন, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে জনগণ কাউকে ছাড় দেবে না। প্রশাসনকে স্পষ্ট করতে হবে তারা দলীয় পরিচয়ধারী সন্ত্রাসীদের পে থাকবে নাকি সাধারণ জনগণের পে থাকবে। তিনি সরকারি দলের দায়িত্বশীল নেতাদের প্রতিও আহ্বান জানিয়ে বলেন, দলের পরিচয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলতে দিয়ে জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া উচিত নয়। ফতুল্লাবাসী একটি সন্ত্রাসমুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশ চায়।