নির্ভুল ভোটার তালিকা করে এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে : ডা: শফিক

Printed Edition
জামায়াতে ইসলামীর সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত
জামায়াতে ইসলামীর সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা আশা করি সরকার সব দলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ-আলোচনা করে আগামী জুলাই মাসের মধ্যেই জুলাই ঘোষণাপত্র পাস করে তার ভিত্তিতে মৌলিক সংস্কার কার্যক্রম শেষ করবেন। তারপর নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধন করে একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা জাতির সামনে পেশ করবেন। সেই ভোটার তালিকায় অবশ্যই প্রবাসী বাংলাদেশী নাগরিকদের তালিকাভুক্ত করতে হবে। তারপরে সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সাধন করে দেশে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের একটি পরিবেশ সৃষ্টি করবেন।

গতকাল রাজধানীর ‘শেরাটন ঢাকা’ হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। সম্মেলনে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও টেলিভিশনের সাংবাদিকদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, পাকিস্তান, ভারত, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্কসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিকরা। জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমাদ আলী কাসেমী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (একাংশের) আমির মাওলানা আবু জাফর কাসেমী ও মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের অপর অংশের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি সুলতান মহিউদ্দিন, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজি, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এস এম ইউসুফ প্রমুখ।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দের সঞ্চালনায় জামায়াত নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, নায়েবে আমির সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ও সাবেক এমপি ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো: তাহের, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, ড. হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবাযের ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, আবদুর রব ও মোবারক হোসাইন, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মো: সেলিম উদ্দিন ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, ছাত্র শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম প্রমুখ।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি না থাকায় জনগণ নানা ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে। এ অবস্থায় জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের সক্ষমতার বিষয়টিও জাতির সামনে পরিষ্কার হবে।

জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে জামায়াত আমির বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ করে অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষিত নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে হবে। আগামী বছর রোজার আগে বা পরে নির্বাচন হতে পারে। তবে সময় বেঁধে দেয়ার কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের নেই।

প্রবাসীদের ভোটার করার ব্যাপারে তিনি গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রবাসীদের ভোটার করার বিষয়ে আমরা অনেক আগে থেকেই কথা বলে আসছি। কিন্তু ইসির দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না, আমরা উদ্বিগ্ন। প্রবাসীদের ভোটার করার বিষয়টি জামায়াত অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে আমাদের প্রত্যাশা তারা যেন তাদের চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা করেন।

তিনি বলেন, দেশের রাজনীতি, সমাজ ও সার্বভৌমত্বের ওপর কারও আধিপত্য আমরা মেনে নিবো না। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। সব দেশের সাথেই আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকবে।

ডা: শফিক বলেন, ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনের সব শর্ত মেনে জামায়াতে ইসলামী নিবন্ধিত হয়েছিল। তারপরও সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অন্যায্যভাবে আদালতের ন্যায়ভ্রষ্ট রায়ের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করা হয়। আমাদের প্রতীকটিও কেড়ে নেয়া হয়েছিল। আমরা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করি। গত ১ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সর্বসম্মত রায়ে হাইকোর্টের দেয়া রায়কে অবৈধ এবং বাতিল ঘোষণা করেন। একই সাথে ২০১৩ সালের আগে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ও প্রতীকের বিষয়টি যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে তারা নির্দেশ প্রদান করেন। আমরা মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। আমরা আশা করছি অতিদ্রুতই অফিসিয়ালি আমাদের নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে পাবো। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কাছে আমাদের প্রত্যাশা তারা যেন তাদের মর্যাদা রক্ষা করেন।

তিনি বলেন, ৫ আগস্টের এই পটপরিবর্তন না হলে হয়তোবা আজকেও আমরা আমাদের অধিকার ফেরত পেতাম না। এ জন্য আমি বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের বিপ্লবীদেরকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। ফ্যাসিবাদের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে গিয়ে যারা জীবন দিয়েছেন আল্লাহ তাদের সবাইকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন। আহত এবং পঙ্গু যারা হয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা। আল্লাহ তাদেরকে ধৈর্য ধরার এবং সুস্থতার নেয়ামত দান করুন।

তিনি আরো বলেন, জামায়াতের সাবেক আমির ও ডাকসুর জিএস প্রফেসর গোলাম আযম প্রণীত কেয়ারটেকার ফর্মুলায় ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়, যা দেশে-বিদেশে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা তুলে দেয়। তারা ২০১৪ সালে বিনা ভোটে, ২০১৮ সালে দিনের ভোট রাতে করে এবং ২০২৪ সালে আমি আর ডামি নির্বাচন করে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়।

তিনি আরো বলেন, আগামীর বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক, দুঃশাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ হোক আমরা এ দোয়াই করি। যুবসমাজের প্রতি আমাদের কমিটমেন্ট আমরা তোমাদের এ দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে দেখতে চাই এবং কারিগর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করতে চাই।

বিএনপির পক্ষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে থেকে নির্বাচনের জোর দাবি জানানো হচ্ছে, ডিসেম্বরে নির্বাচন হলে জামায়াত প্রস্তুত কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, না, ডিসেম্বর কেন, আজও যদি দেখি যে সমতল মাঠ তৈরি হয়ে গেছে, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে জাতি প্রস্তুত, সব অঙ্গ প্রস্তুত, তাহলে তো আমরাও নির্বাচনে যাবো। আমাদের নির্বাচনে যেতে কোনো সমস্যা নেই। এই বিষয়গুলো পরিষ্কার না করে, ডিসেম্বর কিংবা এপ্রিলে বলে কোনো লাভ হবে না।

নিবন্ধন কেড়ে নেয়া ও এর সাথে যারা সংশ্লিষ্ট ছিল তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন কি না- জানতে চাইলে জামায়াত আমির বলেন, তাদের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে এখনো আমরা সিদ্ধান্ত নিইনি। এ বিষয়ে আমরা চিন্তা করব।

নির্বাচন কমিশনের ওপর আপনাদের আস্থা আছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনকে সময় দিতে চাই। আমরা তাদের পারফরম্যান্স আরো দেখতে চাই। তারা কর্ম দিয়েই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ইউনিয়ন কমিশনার ছাড়া আর কোনো পর্যায়ে কার্যক্রম নেই। এ কারণে জনগণ কষ্টে আছে। তাই স্থানীয় নির্বাচন আগে হওয়া দরকার বলে মনে করি। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন তাদের সামর্থ্য দেখাতে পারবে।