নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম
দেশের চা বাগান ও চা কারখানাগুলো বছরের পর বছর উৎপাদিত চাপাতা খোলাবাজারে বিক্রি করে বিপুল অঙ্কের সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে এমন অভিযোগ উঠেছে। শুধু ২০২৫ সালেই ১৭২টি চাবাগান ও ৩১টি বটলিফ কারখানার (ক্ষুদ্রায়তন বাগানের চা কিনে প্রক্রিয়াজাতকারী) তথ্য যাচাই করে এক বছরে প্রায় ৯০ লাখ কেজি চা নিজেরা বিক্রি করে ৫০ কোটি টাকার মতো সরকারি রাজস্ব ফাঁকির তথ্য মিলেছে। তাও আবার বাগান ও কারখানাগুলোর নিজস্ব কারখানার সেলফ ডিক্লারেশনে প্রাপ্ত তথ্যেই এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা উঠে এসেছে। অতি সম্প্রতি একটি মাত্র বাগানের রাজস্ব ফাঁকি বাবদই দুই কোটি ৮১ লাখ টাকা সরকারি রাজস্ব পাওনা নির্ধারিত হয়েছে। ইতোমধ্যে সব চাবাগান ও কারখানা মালিককে এ বিষয়ে শুনানিতে হাজির হওয়ার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দেশের ১৭২টি চা বাগান সরকারি জমি কম মূল্যে লিজ নিয়ে ভর্তুকির সার ব্যবহার করে চা উৎপাদন করছে। সরকারের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সুবিধা নিয়ে কারখানায় চা প্রক্রিয়াজাত করছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্রায়তন চাচাষ তথা নন গার্ডেন টি কিনে নিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য দেশের উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়ে ৩১টি বটলিফ কারখানা স্থাপন করা হয়েছে।
চা আইন অনুযায়ী চা বোর্ডের অনুমতি ব্যতীত খোলাবাজারে বিক্রির সুযোগ নেই। চা বিক্রি করতে হবে আন্তর্জাতিক চা নিলামের মাধ্যমে। আর নিলামের মাধ্যমে বিক্রীত চা থেকে ১৫% ভ্যাট ও ১% আয়কর মিলিয়ে সরকার ১৬ শতাংশ রাজস্ব পায় এবং চা বোর্ড ১% উপকর পায়। কিন্তু সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে উৎপাদিত চায়ের ওপর প্রাপ্য সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিতে নিলামের পরিবর্তে খোলা বাজারে চা বিক্রি করে দিচ্ছে অসাধু বাগান ও কারখানা মালিকরা। বেশির ভাগ বাগানেই উৎপাদিত চাপাতা এবং নিলামে বিক্রির পরিমাণে বিরাট ফাঁক থাকলেও সামান্য কিছু বাগানের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র গ্যাপের যৌক্তিক কারণও পেয়েছে চা বোর্ড।
সূত্র জানিয়েছে, রিটার্ন-১ ও রিটার্ন-২ এর ভিত্তিতে মাসিক ও বার্ষিক চা উৎপাদন এবং নিলামে বিক্রির তথ্য চাওয়া হয় বাগান মালিক ও বটলিফ কারখানার মালিকদের কাছ থেকে। তাদের সরবরাহকৃত সেলফ ডিক্লারেশনের তথ্য পর্যালোচনা করে চা বোর্ডের কর্মকর্তারা উৎপাদন ও নিলামে বিক্রির মধ্যে বড় ধরনের ফারাক দেখতে পান। এর বাইরে চা কারখানার ক্ষেত্রে তথ্যের গরমিল বের করতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাবও সহায়ক তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
সূত্র জানিয়েছে, সাধারণত প্রতি কেজি চা উৎপাদনে দশমিক ৮৫ ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে। তবুও প্রতি কেজিতে এক ইউনিট বিদ্যুতের ব্যবহার ধরে হিসাব করেও বড় ধরনের ফারাক পেয়েছে উৎপাদন ও বিদ্যুতের ব্যবহারে। চা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা মনে করেন অতিরিক্ত যত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়েছে তত কেজি চাপাতা বাইরে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। চা বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী ৩১টি বটলীফ কারখানায় ২০২৫ সালে দুই কোটি ৫৬ লাখ ৩৫ হাজার ৪৫৪ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু চা উৎপাদন দেখানো হয়েছে দুই কোটি দুই লাখ ৪২ হাজার ৫২ কেজি। এতে ৫৩ লাখ ৯৩ হাজার ৪০২ কেজি চা উৎপাদন কম দেখানো হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া ১৭২টি বাগানে প্রায় ৪০ লাখ কেজি চাপাতা নিলাম বহির্ভূতভাবে বিক্রি করা হয়েছে বলে সূত্র জানায়।
সূত্র মতে, কয়েকটি চাবাগানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জঙ্গলবাড়ি চাবাগানে দুই লাখ ৩৩ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হলেও নিলামে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৪৯ হাজার কেজি। খাদিম টি গার্ডেনে এক লাখ ৪৮ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছে, আর নিলামে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩১ হাজার কেজি। ডিউন্ডি চাবাগানে চার লাখ ৫৫ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হলেও নিলামে বিক্রি হয় দুই লাখ ৪৪ হাজার কেজি। হোসনাবাদ চাবাগানে এক লাখ ৭৩ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয় আর নিলামে বিক্রি হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার ৩০০ কেজি।


