বিশেষ সংবাদদাতা
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল দেশ। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক রাজনৈতিক দলগুলোকে দেয়া সাত দিনের সময়সীমা শেষ হয়েছে। কিন্তু গণভোট, নির্বাচনী রূপরেখা কিংবা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। এরপর কী হবে? সরকার কি এককভাবে রোডম্যাপ ঘোষণা করবে, নাকি আবারো আলোচনার চেষ্টা করবে -এই প্রশ্নই এখন সর্বত্র।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত সপ্তাহে সব রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেছিল, গণভোটের কাঠামো, নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে সাত দিনের মধ্যে অবস্থান জানান। কিন্তু সোমবার সেই সময় শেষ হলেও কোনো দলই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি প্রত্যাশিত হলেও এখন সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার বৈধতা অর্জন করেছে।
হাইকোর্টের নতুন রায় : ইসির কর্তৃত্ব প্রশ্নের মুখে : এমন সময়েই হাইকোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, বাগেরহাটে চারটি এবং গাজীপুরে পাঁচটি সংসদীয় আসনই বহাল থাকবে, নির্বাচন কমিশনের আসন কমানো গেজেটকে অবৈধ ঘোষণা করেছে আদালত।
বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি ইসির একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর বিচার বিভাগীয় নজরদারি প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার এখন ‘আদালতের নির্দেশনাকে ভিত্তি করে’ নতুন আসন পুনর্বিন্যাস, গেজেট সংশোধন ও গণভোট প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করতে পারে।
সরকারের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ : প্রথমত-এককভাবে গণভোটের রোডম্যাপ ঘোষণা করা। রাজনৈতিক ঐকমত্য না এলে সরকার আগামী সপ্তাহেই গণভোটের তারিখ ও প্রশ্নপত্র প্রকাশ করতে পারে। জুলাই সনদের আলোকে তিনটি প্রশ্ন উঠতে পারে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন, রাজনৈতিক দল পুনর্গঠন নীতি, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার কাঠামো। এই গণভোটের ফলাফলই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কাঠামো কেমন হবে- সংসদীয়, রাষ্ট্রপতি নাকি মিশ্র।
দ্বিতীয়ত, হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনকে নতুন সীমানা ও আসন কাঠামো গেজেট প্রকাশ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বৈধতার ভিত্তি তৈরি করবে। ইসির নতুন সীমানা প্রকাশের পর সরকার গণভোট বা ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ করতে পারবে।
এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মামলা এখন আপিল ভিাগে বিচারাধীন রয়েছে। রাজনীতি নির্বাচন ও সরকারের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য উন্মুক্ত দরজা : অন্তর্বর্তী সরকার এখনো আলোচনার পথ বন্ধ করেনি।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ‘যেকোনো দল চূড়ান্ত ঘোষণার আগে আলোচনায় বসতে চাইলে সরকার স্বাগত জানাবে।’ তবে এবার আর সময় বাড়ানো হবে না।
দলগুলোর অবস্থান : কে কোথায় দাঁড়িয়ে
বিএনপি গণভোটের প্রশ্নে সম্মত হলেও সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট একই দিন চাইছে। গণভোটে নোট অব ডিসেন্টের বিষয় আলাদা দেখতে চায় দলটি। জামায়াত ও সমমনা ইসলামপন্থী জোট বলছে, সাধারণ নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে হবে। এটি নভেম্বর বা ডিসেম্বরে হতে পারে। এনসিপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গ্যারান্টি চাইছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট : যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও জাতিসঙ্ঘ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পক্ষে। ভারত ও চীন, দুই প্রতিবেশীই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ভারত চায় ‘নির্বাচনী স্থিতিশীলতা তাদের স্বার্থ বজায় থাকুক’। আর চীন বলছে, ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও শান্তিপূর্ণ রূপান্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
বিশ্লেষকদের ধারণা রাজনৈতিক সময়সীমা শেষ হওয়া মানে প্রক্রিয়া থেমে যাওয়া নয়, বরং এটি রূপান্তরের দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশের সূচনা। অন্তর্বর্তী সরকার এখন ‘সম্মতি ছাড়া সিদ্ধান্ত’ নেয়ার নৈতিক ও প্রশাসনিক বৈধতা অর্জন করেছে, কারণ তারা আলোচনার সুযোগ দিয়েছে এবং সংলাপের পথ খুলে রেখেছে। তবে সরকার দলগুলো প্রকাশ্যে আলোচনার জন্য না এলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে তাদের মতামত নিতে পারে।
তবে প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করবে সরকার কতটা স্বচ্ছভাবে গণভোট আয়োজন করে, আন্তর্জাতিক অংশীদার ও জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারে কি না এবং রাজনৈতিক দলগুলো শেষ মুহূর্তে কতটা গণতান্ত্রিক সমঝোতায় ফিরতে পারে তার ওপর।



