পিলখানা দরবার হলে রক্তাক্ত সকালের ‘ডেথ করিডোর’

এক ঘণ্টায় ধ্বংস হলো একটি বাহিনীর নেতৃত্ব

এই এক ঘণ্টায়- শৃঙ্খলা ভেঙেছে; নেতৃত্ব ভেঙেছে; পরিবার ভেঙেছে; রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকাঠামো ভেঙেছে। দরবার হলের সেই মেঝে শুধু রক্ত দেখেনি, দেখেছে বিশ্বাসঘাতকতা, আতঙ্ক, অসহায়তা।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশ রাইফেলসের ঢাকার পিলখানা সদর দফতর। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির সেই সকালটি ছিল নিয়মিত ‘দরবার’-এর দিন। শৃঙ্খলা, ব্রিফিং আর আনুষ্ঠানিকতার এই জায়গাটি শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের সাক্ষ্যভিত্তিক বিবরণ বলছে- এ দিন সকাল ১০টা ৩০ মিনিটের পর থেকেই শুরু হয় পরিকল্পিত অবরোধ, নিরস্ত্রীকরণ, তারপর লক্ষ্যভিত্তিক গুলি। যেন একটি স্ক্রিপ্ট লেখা ছিল আগেই। আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সাক্ষ্য, বর্ণনা ও সময়রেখা মিলিয়ে দেখা যায়- মাত্র এক ঘণ্টায় একটি বাহিনীর পুরো নেতৃত্বকাঠামো ভেঙে দেয়া হয়। এটি ছিল না কোনো আকস্মিক উত্তেজনা; বরং ধাপে ধাপে সাজানো নিয়ন্ত্রণ, নিরস্ত্রীকরণ, বিচ্ছিন্নকরণ এবং হত্যার প্রক্রিয়া।

দরজা বন্ধ, চিৎকার শুরু : দরবার হলের ভেতরে হঠাৎ উত্তেজিত কণ্ঠ। ‘বের হন, হাত তোলেন’। মুখ ঢেকে অস্ত্রধারীরা একে একে কর্মকর্তাদের দাঁড় করায়। মোবাইল কেড়ে নেয়। সবাইকে মেঝেতে শুতে বাধ্য করা হয়। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরিবেশ বদলে যায়- সভা থেকে জিম্মি পরিস্থিতি। অফিসারদের চোখে তখনো অবিশ্বাস- এটা কি বিদ্রোহ, নাকি ভুলবোঝাবুঝি?

১০টা ৩৫ মিনিটে প্রথম গুলির শব্দ : মেঝেতে শোয়া অবস্থায় থাকা কর্মকর্তাদের ওপর কাছ থেকে গুলি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল কায়সার গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান। রক্ত দ্রুত ছড়িয়ে যায়। সহকর্মীরা তাকে তুলতে গেলে বাইরে থেকে বাধা ‘কেউ যাবে না, এখানেই মরবে’। এ যেন চিকিৎসাবঞ্চনা দিয়ে মৃত্যুকে নিশ্চিত করার কৌশল।

১০টা ৪০-১০টা ৪৫- সারিবদ্ধ করে বের করা : অফিসারদের এক লাইনে দাঁড় করানো হয়। পশ্চিম গেটের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। মেজর সালেহের পেটে গুলি লাগে দরজা পেরোনোর মুহূর্তে। কারো ইউনিফর্ম ছিঁড়ে যাচ্ছে, কারো রক্তে ভিজে যাচ্ছে মেঝে। দরবার হলের সেই করিডোর তখন আর প্রশাসনিক পথ নয়- এটা যেন ‘ডেথ করিডোর’।

বাইরে কী হচ্ছিল : আরেকদল অস্ত্রধারী চিৎকার করছে- ‘অফিসারদের শেষ করো’।

রাইফেলের বাঁট, বেয়নেট, লাথি- অমানবিক প্রহার। চোখ বেঁধে লাইনে দাঁড় করানো। গুলির প্রস্তুতি। কেউ কেউ মৃত সেজে পড়ে থাকেন। কারো চোয়াল ভেঙে যায় আঘাতে। কেউ মেঝের নিচে, টয়লেটের আড়ালে, ভাঙা দেয়ালের পাশে আশ্রয় নেন। বাঁচা তখন কৌশল, শ্বাস নেয়াও ঝুঁকি।

নারী চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের আলাদা : ‘ম্যাডামদের মারিস না- ওরা ডাক্তার’। এই নির্দেশে কয়েকজনকে একটি পিকআপে তোলা হয়। গাড়ির ভেতরে পড়ে আছে গুলির বাক্স। তবু এটিই ছিল জীবন বাঁচানোর একমাত্র সুযোগ। পেছনে থেকে যাওয়া পুরুষ কর্মকর্তাদের ওপর চলতে থাকে আক্রমণ।

১১টার দিকে হলের ভেতরে মৃত্যুনীরবতা : টয়লেটের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক কর্মকর্তা শুনতে পান ‘ডিজি শেষ’। তারপর আবার গুলি, আবার উল্লাস। কেউ ফিসফিস করে দোয়া পড়ছেন। কেউ পরিবারের কথা ভাবছেন। কেউ মৃত সহকর্মীর রক্ত শরীরে মেখে নিথর হয়ে আছেন- শুধু বেঁচে থাকার জন্য।

১১টা ১০-১১টা ৩০; খোঁজাখুঁজি ও ফিনিশিং : লুকিয়ে থাকা অফিসারদের খুঁজে বের করা হয়। কেউ গুলি খেয়ে সেখানেই মারা যান। কেউ আহত হয়েও চুপচাপ পড়ে থাকেন।

কমিশনের ভাষায়, ‘টার্গেটেড ফায়ারিং’; মানে নির্দিষ্ট করে কর্মকর্তাদের হত্যা। এটা আর বিক্ষোভ ছিল না। এটা ছিল নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন করার অপারেশন।

মানবিক ট্র্যাজেডি : এই এক ঘণ্টায়- শৃঙ্খলা ভেঙেছে; নেতৃত্ব ভেঙেছে; পরিবার ভেঙেছে; রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকাঠামো ভেঙেছে। দরবার হলের সেই মেঝে শুধু রক্ত দেখেনি, দেখেছে বিশ্বাসঘাতকতা, আতঙ্ক, অসহায়তা।

কেউ শেষবার বলেছিলেন, ‘হাসপাতালে নিতে দিন’; কিন্তু উত্তর এসেছিল ‘কেউ কোথাও যাবে না।’

মৃত্যু করিডোর : ১০টা ৩০ থেকে ১১টা ৩০- মাত্র এক ঘণ্টা। ইতিহাসে এমন কিছু সময় থাকে যা পুরো জাতির স্মৃতিতে স্থায়ী দাগ কেটে দেয়। পিলখানার সেই দরবার হল তেমনই একসময়ের সাক্ষী- যেখানে অফিসাররা যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, নিজের ঘাঁটিতেই নিহত হয়েছিলেন। নিজের সদর দফতরে, নিজের লোকদের হাতে নিহত হন অফিসাররা। কিন্তু এর পেছনে হাত অনেক লম্বা, দেশ ছাড়িয়ে আরো দূর। পিলখানার দরবার হল শুধু একটি ভবন নয়, এটা বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতিস্তম্ভ। সেই এক ঘণ্টা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- রাষ্ট্রের ভেতরের ভাঙন কখনো কখনো বাইরের শত্রুর চেয়েও ভয়ঙ্কর। সেই ভাঙনের পেছনে যদি থাকে অন্য কোনো কালো হাত-তাহলে হয় আরো ভয়ঙ্কর।