বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ২০১৩ সাল থেকে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ (আইসিটি) বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়। নতুন এ বিষয়টিতে শুধু তাত্ত্বিক বিষয় নয় প্রোগ্রামিং, কোডিং, লজিক গেট, অ্যালগরিদম, ডাটাবেজ ও ওয়েব ডিজাইনের মতো জটিল ব্যবহারিক অংশ রয়েছে। ফলে প্রথম থেকেই শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত পাঠ্য ও সহায়িকা বইয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
শুরুর দিকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে লেখক ও প্রকাশকদের কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি আহ্বান করেছিল। একাধিক বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নের পর যেসব বই মানসম্মত বিবেচিত হয়, সেগুলোকে অনুমোদন দেয়া হয়। বিভিন্ন বেসরকারি প্রকাশনী এনসিটিবির অনুমোদনক্রমে বইগুলো প্রকাশ করে। কলেজ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী এসব বই ব্যবহার শুরু করেন, যা একটি কার্যকর শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করেছিল। কিন্তু ২০১৯ সাল পর্যন্ত এ ব্যবস্থা সচল থাকার পর হঠাৎ করেই চিত্র বদলে যায়।
হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন?
অভিযোগ রয়েছে, পূর্বের অনুমোদিত বইয়ের লেখক ও প্রকাশকদের আর পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ না দিয়ে এবং কোনো উন্মুক্ত পাণ্ডুলিপি আহ্বান ছাড়াই এনসিটিবি নিজস্ব উদ্যোগে একটি নতুন পাঠ্যবই প্রস্তুত করে।
এখানে প্রশ্ন ওঠে একটি জাতীয় পর্যায়ের পাঠ্যবই তৈরির ক্ষেত্রে পূর্বের স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া কেন রাতারাতি রুদ্ধ করা হলো?
আরো অভিযোগ আছে, একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় বইটি প্রকাশের সুযোগ দেয়া হয় এবং এনসিটিবি নিজে এ বই থেকে ‘রয়্যালটি’ গ্রহণের ব্যবস্থা করে। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান একই সাথে বইয়ের অনুমোদনকারী, প্রস্তুতকারী এবং রয়্যালটি গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত? এতে আইনের কোনো লঙ্ঘন ঘটেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের চাহিদা কি বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল?
আইসিটির মতো প্রায়োগিক বিষয় শিখতে শুধু সংক্ষিপ্ত পাঠ্যবই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সহজ ভাষায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা, পর্যাপ্ত উদাহরণ ও অনুশীলন। এনসিটিবির তৈরি বইটি তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত হওয়ায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষকদের বাড়তি অনুশীলনের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বিভিন্ন সহায়ক বইয়ের দিকে ঝুঁকেছেন।
সহায়ক বই ব্যবহার কি কোনো অপরাধ?
বাংলা, ইংরেজি বা বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ে যদি সহায়ক বই ও অনুশীলনী গ্রন্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকে, তবে আইসিটির মতো জটিল বিষয়ে তা বন্ধ করা হবে কেন? সম্প্রতি পত্রিকায় সতর্কবার্তা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট বই ছাড়া অন্য সহায়িকা বই ব্যবহার করলে কলেজের অনুমোদন বাতিল এবং বিক্রির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ক্ষেত্রে সরাসরি প্রশ্ন জাগে : কোন আইনের কোন ধারায় শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক বা রেফারেন্স বই ব্যবহার কিংবা বিক্রি নিষিদ্ধ করা হলো? যদি কোনো বই কপিরাইট লঙ্ঘন করে বা ভুল তথ্য দেয়, তবে সুনির্দিষ্ট সেই বইটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ঢালাওভাবে সব সহায়িকা বই নিষিদ্ধ করার আইনগত ভিত্তি কী?
শিক্ষার্থী ও শিক্ষার স্বার্থ আগে, নাকি বইয়ের বাজার?
উচ্চমাধ্যমিকের আইসিটি বইয়ের বাজার বিশাল। তবে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ নির্দিষ্ট ব্যবসা বা বাজার দখল সুগম করা নয়; বরং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। এনসিটিবির বই যদি মানসম্পন্ন ও সর্বাধুনিক হয়, তবে শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তা গ্রহণ করবেন। বাজারে প্রতিযোগী সহায়ক বই প্রশাসনিক আদেশে বন্ধ করে কোনো বইয়ের একচ্ছত্র বাজার তৈরি করা শিক্ষার মানোন্নয়নের উপায় হতে পারে না। এ ছাড়া, এনসিটিবি আইন-২০১৮ অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও প্রকাশের ক্ষমতা থাকলেও বইপ্রতি রয়্যালটি গ্রহণের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও নীতি ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। যে প্রতিষ্ঠান নিজেই বইয়ের রয়্যালটি পায়, সেই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অন্যান্য সহায়ক বই নিষিদ্ধ করার মধ্যে স্বার্থের সংঘাত বিদ্যমান কি না, তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।
প্রয়োজন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসিটি পাঠ্যবই ও সহায়ক বই সংক্রান্ত এই জটিলতা নিরসনে নিচের প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর মেলা জরুরি : ১. আগের অনুমোদিত বই বাতিল এবং নতুন বই প্রণয়নে আগের স্বচ্ছ পদ্ধতি কেন বর্জন করা হলো? ২. বই মুদ্রণ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া (টেন্ডার) কিভাবে পরিচালিত হয়েছিল? ৩. এনসিটিবি কর্তৃক রয়্যালটি গ্রহণের আইনগত ভিত্তি ও এর হিসাব কতটুকু স্বচ্ছ? ৪. কিসের ভিত্তিতে এবং কোন আইনের বলে সহায়িকা বই নিষিদ্ধের মতো সিদ্ধান্ত নেয়া হলো? ৫. এই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া হয়েছিল কি না?
সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চমাধ্যমিকের আইসিটি শিক্ষা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা প্রকাশনা ব্যবসার বিষয় নয়; এর সাথে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও দেশের তথ্যপ্রযুক্তিগত সক্ষমতা জড়িত। বাজারে কৃত্রিম একচেটিয়াতন্ত্র তৈরি না করে মানের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেয়া উচিত। শিক্ষার্থীদের ভালো বই বেছে নেয়ার স্বাধীনতা সঙ্কুচিত না করে শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা, আইন ও শিক্ষার্থীর স্বার্থকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া উচিত।



