প্রতিহিংসার বদলে জাতীয় ঐক্য : সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার বিরল সৌজন্য
সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের দীর্ঘদিনের তিক্ততা, বর্জন আর কাদা ছোড়াছুড়ির সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানের মধ্যে অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক আলোচনা সংসদীয় গণতন্ত্রের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্র সংস্কারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিরোধী দলের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করে বলেন, “আমরা এমন একটি সংসদ গড়তে চাই যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু দেশের স্বার্থে থাকবে ইস্পাতকঠিন ঐক্য।” অন্য দিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান প্রতিহিংসার রাজনীতি সমাহিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমরা ছায়া মন্ত্রিসভার মতো কাজ করব এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করব।”
রাজনৈতিক দর্শনে কৌশলগত পরিবর্তন
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেড় দশকের একদলীয় শাসনব্যবস্থার অবসানের পর নবনির্বাচিত সংসদে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের রাজনৈতিক দর্শনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। সংসদকে কেবল সরকারি দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের রাবার স্ট্যাম্প না বানিয়ে জাতীয় বিতর্কের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে দুই দলই ঐকমত্য পোষণ করেছে।
ব্যক্তিগত আক্রমণ বন্ধ : সংসদীয় কার্যক্রমে গালিগালাজ ও ব্যক্তিগত আক্রমণ বন্ধে উভয় দলের হাইকমান্ড থেকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
যুক্তিভিত্তিক বিতর্ক : সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যেখানে তথ্যের বিকৃতি নয় বরং যুক্তি ও উপাত্তের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।
বিপ্লবের চেতনা : ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে ‘জুলাই সনদ’ বা শহীদের রক্ত ও ত্যাগের কথা স্মরণ করা হচ্ছে।
বিশিষ্টজনদের পর্যবেক্ষণ : ‘ঐতিহাসিক মোড়’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, “এবারের সংসদের প্রথম অধিবেশন ছিল অনেক বেশি প্রাণবন্ত। দীর্ঘ সময় পর সংসদে কোনো এক দলের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের পরিবর্তে প্রকৃত সংসদীয় বিতর্ক দেখা গেছে।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বিরোধী দল কেবল হইচই না করে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সরকারের সমালোচনা করছে- এটি ইতিবাচক। তবে বিএনপি ও জামায়াতের এই কৌশলগত সমন্বয় যেন কেবল ক্ষমতা ভাগাভাগির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকে জনগণের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, বিরোধী দলের সংসদ বর্জন না করা এবং সরকারি দলের নমনীয় আচরণ গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, “বিরোধীদের স্পেস দেয়া সরকারি দলের দায়িত্ব, যা এবার দৃশ্যমান হয়েছে।”
তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা ও নতুন চ্যালেঞ্জ
অধিবেশনে বেশ কয়েকজন তরুণ সংসদ সদস্যের বলিষ্ঠ বক্তব্য এবং শিক্ষা, প্রযুক্তি ও গণভোট সংক্রান্ত দাবিগুলো নজর কেড়েছে। তরুণদের ভাষ্য, সংসদকে হতে হবে ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশের প্রকৃত রূপকার। তবে বিশিষ্টজনদের একটি অংশ কট্টরপন্থী কোনো এজেন্ডা এনে জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টার বিষয়ে সংসদ সদস্যদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদকে কার্যকর রাখা এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এ প্রতিবেদককে জানান, “এই সংসদ শুধু আইন প্রণয়নের কেন্দ্র নয় বরং এটি একটি পরিবর্তনশীল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু। আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি চিরতরে সমাহিত করতে কাজ করছি।”
উপসংহার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের এই ইতিবাচক ধারা যদি পরবর্তী পাঁচ বছর বজায় থাকে, তবে বাংলাদেশ সত্যিকারের একটি কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। রাজনীতিতে এমন ‘ইতিবাচক প্রতিযোগিতাই’ চব্বিশের বিপ্লবের মূল আকাক্সক্ষা ছিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।



