যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ও তার মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (ম্যাগা) ঘনিষ্ঠরা মিনিয়াপোলিসে অ্যালেক্স প্রেটির হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেয়া বক্তব্যে ব্যাপক বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়াচ্ছে। রোববার মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) দাবি করে, ৩৭ বছর বয়সী আইসিইউ নার্স প্রেটি ৯ এমএম সেমি-অটোমেটিক পিস্তল হাতে মার্কিন সীমান্তরক্ষীদের দিকে এগিয়ে যান এবং তাকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করলে তিনি সহিংসভাবে প্রতিরোধ করেন।
তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, শনিবার প্রেটি মার্কিন সীমান্তরক্ষীদের একটি দলকে ভিডিও করছিলেন এবং এক নারীকে একজন এজেন্ট মাটিতে ফেলে দিলে তিনি তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে যান। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ড্রপ সাইট নিউজে প্রকাশিত ফুটেজে দেখা যায়, প্রেটি ওই নারীকে সাহায্য করার চেষ্টা করলে অন্তত পাঁচজন এজেন্ট তাকে মাটিতে ফেলে দেন এবং বরফাচ্ছন্ন রাস্তায় ধস্তাধস্তির পর তাকে একাধিকবার গুলি করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ও নেদারল্যান্ডসভিত্তিক অনুসন্ধানী সংস্থা বেলিংক্যাটের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গুলি করার আগে প্রেটির অস্ত্র একজন এজেন্টের হাতে জব্দ হয়ে গিয়েছিল।
মিনিয়াপোলিসের পুলিশপ্রধান ব্রায়ান ও’হারা জানান, প্রেটি বৈধ অস্ত্রধারী ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে কেবল কয়েকটি ট্রাফিক মামলার রেকর্ড রয়েছে। তবুও সীমান্তরক্ষীদের কমান্ডার গ্রেগ বোভিনো সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রেটির অস্ত্র প্রমাণ করে তিনি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ওপর বড় ধরনের হামলা চালাতে চেয়েছিলেন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির উপপ্রধান স্টিফেন মিলার কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন, প্রেটি একজন ‘হত্যাকারী’ ছিলেন, যিনি ‘ফেডারেল এজেন্টদের হত্যা করতে চেয়েছিলেন’। ডিএইচএস সচিব ক্রিস্টি নোয়েম বলেন, তিনি ‘সহিংসভাবে’ গ্রেফতার প্রতিরোধ করেছিলেন। ট্রাম্পপন্থী ডানপন্থী প্রভাবশালীরা এসব দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ছড়িয়ে দেন।
ম্যাগা-ঘনিষ্ঠ ‘লিবস অব টিকটক’ অ্যাকাউন্ট প্রেটিকে ‘উন্মাদ’ ও ‘হত্যাকারী’ বলে অভিহিত করে। ডানপন্থী প্রভাবশালী আলেকজান্ডার মিউজ তার ছয় লাখ ৮১ হাজার অনুসারীর কাছে দাবি করেন, প্রেটি দূর থেকে গুলিবিনিময়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, যদিও তার অস্ত্র ব্যবহার বা প্রদর্শনের কোনো প্রমাণ নেই। ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ নিক সোটার, যার এক্স-এ অনুসারী ১.৪ মিলিয়ন, মিথ্যাভাবে দাবি করেন, প্রেটি একজন ‘অবৈধ অভিবাসী’ ছিলেন, যিনি ‘এজেন্টদের ওপর অস্ত্র তুলে ধরতে চেয়েছিলেন’। রক্ষণশীল পডকাস্টার জেসি কেলি প্রেটিকে ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবের সৈনিক’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, তিনি ‘যুদ্ধে মারা গেছেন’ এ বক্তব্যের সাথে প্রেটির একটি হাইকিং ছবিও যুক্ত করেন। ম্যাগা-ঘনিষ্ঠ অ্যাকাউন্টগুলো প্রেটির নারীদের পোশাকে সজ্জিত ডিজিটালি পরিবর্তিত ছবি ছড়িয়ে দেয়। প্রেটির বাবা-মা এক বিবৃতিতে বলেন, তাদের ছেলে একজন ‘সহানুভূতিশীল মানুষ’ ছিলেন এবং প্রশাসনের ‘বিকৃত মিথ্যাচার’ ছিল ‘ঘৃণ্য ও নিন্দনীয়’।
প্রেটিকে ‘দেশীয় সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করা এবং তার রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলা এর আগে মিনিয়াপোলিসে বন্দী রেনে গুডকে কেন্দ্র করে একই ধরনের অভিযোগ দেখা গেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা রেনে গুডকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন, তিনি তার গাড়ি দিয়ে একজন অভিবাসন কর্মকর্তাকে চাপা দিতে চেয়েছিলেন, যদিও ভিডিও প্রমাণে সেই দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে চলমান প্রতিবাদকে দুর্বল করতে প্রশাসন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউজ এক গ্রেফতারকৃত কর্মী নেকিমা লেভি আর্মস্ট্রংয়ের ছবি প্রকাশ করে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পরিবর্তন করে তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত দেখানো হয়।
কিছু রিপাবলিকান নেতাও প্রেটির মৃত্যুকে ঘিরে প্রচারিত বর্ণনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। কেন্টাকির প্রতিনিধি থমাস ম্যাসি বলেন, ‘অস্ত্র বহন করা মৃত্যুদণ্ড নয়, এটি সংবিধানসম্মত অধিকার।’ প্রো-গান লবি গ্রুপ ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনও ট্রাম্প-নিযুক্ত এক ফেডারেল প্রসিকিউটরের সেই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে, যেখানে বলা হয়েছিল, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সামনে অস্ত্র নিয়ে যাওয়া মানেই গুলি করার সুযোগ। মিনেসোটা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছিলেন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ফেডারেল তদন্তে সহায়তা করেনি। রোববার মিনেসোটা পাবলিক সেফটি বিভাগের অপরাধ তদন্ত ব্যুরো জানায়, আসলে তারাই বাধার মুখে পড়েছে এবং ডিএইচএস তাদের ঘটনাস্থলে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি।



