নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়েরের পরদিনই রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার, নাটোরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং লালপুরের ইউএনওকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক দু’টি প্রজ্ঞাপনে এই বদলির আদেশ দেয়া হয়। এর আগে ওইদিন দুপুরে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো: আবদুল বারীর দফতরে গিয়ে এই কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন লালপুর-বাগাতিপাড়ার সংসদ সদস্য এবং সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মিজ ফারজানা শারমীন পুতুল। তার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো: আবদুল বারী মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দিলে ওই রাতেই তাদের প্রত্যাহার করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এই আকস্মিক প্রত্যাহারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ নুর এ আলম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. এ এন এম বজলুর রশীদকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। সিনিয়র সহকারী সচিব বরমান হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশে নাটোরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসমা শাহীনকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগীয় সিনিয়র সহকারী কমিশনার প্রীতিলতা বর্মণ স্বাক্ষরিত অপর এক আদেশে লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: বরকত উল্লাহকে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বদলি করা হয়।
এর আগে গত ১২ আগস্ট ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষের জেরে লালপুর ও বাগাতিপাড়া ইউএনও কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটে। সোমবার এ ঘটনায় লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো: আবু মাসুদ রানা এবং বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো: শুকুর আলী বাদি হয়ে নিজ নিজ থানায় দু’টি এজাহার দায়ের করেন। এজাহার দু’টিতে সরকারদলীয় ২৫ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরো ১৪০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়।
লালপুরে দায়ের করা এজাহারে অভিযুক্ত ১৮ জন হলেন- গোপালপুর পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো: নজরুল ইসলাম মোলাম, বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান মো: সিদ্দিক আলী মিষ্টু, ঈশ্বরদী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান মো: আবদুল আজিজ রঞ্জু, উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মো: হারুন অর রশিদ পাপ্পু, চংধুপইল ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো: জিল্লুর রহমান জুলহাস, উপজেলা বিএনপির সাবেক ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ফিরোজ উদ্দিন, কদিমচিলান ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো: আবদুল বারী কাজল, কদিমচিলান ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মো: হযরত আলী, দুয়ারিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো: শাহিনুর রহমান, আরবাব ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো: জাহাঙ্গীর আলম, কদিমচিলান ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো: হযরত আলী, চংধুপইল ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইলিয়াস হোসেন, এবি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোহাম্মদ আবেদ আলী, লালপুর ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক/সদস্য সচিব মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম রবি, পৌর বিএনপির মোহাম্মদ আলী আজম, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রায়হান কবীর সুইট, উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবু রায়হান এবং পৌর যুবদলের মো: সুমন। এ ছাড়া অজ্ঞাত আরো ৪০-৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
অন্য দিকে বাগাতিপাড়ায় দায়ের করা এজাহারে অভিযুক্ত সাতজন হলেন- উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রানা, যুগ্ম আহ্বায়ক তারিক আজিজ, উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য আশিকুর রহমান, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোশারফ হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান, বাগাতিপাড়া পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোতালেব আলী পান্না এবং উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সাব্বির হোসেন মুন্না। দায়েরকৃত এজাহারে অজ্ঞাত আরো ১০০-১৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এই ঘটনায় সচেতন মহল এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, হামলাকারী ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় যদি কর্মকর্তাদেরই প্রত্যাহারের শিকার হতে হয়, তবে মাঠ প্রশাসনে সৎ ও নির্ভীক কর্মকর্তাদের পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর হামলা মানে সরকারের ওপরই হামলা। লালপুর-বাগাতিপাড়ায় ইউএনও অফিস ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা করার পরেই তাদের প্রত্যাহার করার বিষয়টি মোটেই সুখকর নয়। এ ধরনের ঘটনা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দেবে এবং দুর্নীতি ও অনিয়মকে উৎসাহিত করবে।
এই ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এতোগুলো ইউএনও অফিসে হামলা হলো সরকারের পক্ষ থেকে একটা স্টেটমেন্ট দেয়া হলো না। এই বিষয়ে আমাদের স্যারদের জোরালো ভূমিকা দরকার সরকারকে বুঝানো।’ আরেকজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এর নাম ক্ষমতা, দা পাওয়ার’।
এ বিষয়ে জানতে গতকাল বিকেল ৫টায় লালপুর-বাগাতিপাড়ার সংসদ সদস্য এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মিজ ফারজানা শারমীন পুতুলকে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।



