লাইসেন্স ছাড়া স’মিল স্থাপন নয়

কাওসার আজম
Printed Edition
  • নতুন বিধিমালার খসড়া প্রকাশ
  • বনভূমি থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে স্থাপনের শর্ত

দেশে অবৈধ কাঠ চিরাই ও বনজ সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার রোধে করাত-কল (স’ মিল) স্থাপন ও পরিচালনায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ‘করাত-কল (লাইসেন্স) বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। খসড়া অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া কোনো করাত-কল স্থাপন বা পরিচালনা করা যাবে না। একই সাথে বনভূমি, আন্তর্জাতিক সীমান্ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকার নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে করাত-কল স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। বিধিমালা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে। প্রস্তুত করা খসড়ার ওপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মতামত আগামী ২২ মার্চের মধ্যে ই-মেইলে (ভড়ৎবংঃ১@সড়বভপপ.মড়া.নফ) পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি লাইসেন্স ব্যতীত করাত-কল স্থাপন বা পরিচালনা করতে পারবেন না। লাইসেন্স পেতে আবেদনকারীকে নির্ধারিত ফরম ‘ক’ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। আবেদন পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য যাচাই করে সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ফরেস্টার, বিট অফিসার বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হবে।

তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ১০ কার্যদিবসের মধ্যে জেলা পর্যায়ের একটি কমিটির কাছে বিষয়টি পাঠাবেন। জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক করে গঠিত ৮ সদস্যের কমিটিতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বা সহকারী বন সংরক্ষক সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করে কমিটি সর্বোচ্চ ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে লাইসেন্স প্রদানের বিষয়ে সুপারিশ করবে।

এর পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুপারিশ পাওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে আবেদনকারীকে লিখিতভাবে জানাবেন। অনুমোদন পেলে আবেদনকারীকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত লাইসেন্স ফি সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে চালানের মূল কপি জমা দিতে হবে। চালান যাচাই শেষে সর্বোচ্চ ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ফরম ‘খ’ অনুযায়ী লাইসেন্স ইস্যু করা হবে। লাইসেন্সের মেয়াদ হবে দুই বছর এবং পরবর্তীতে দুই বছর মেয়াদে নবায়ন করা যাবে।

বিধিমালায় লাইসেন্সের মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও পৃথক বিধান রাখা হয়েছে। করাত-কলের মালিকানা পরিবর্তন হলে প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ ফরম ‘গ’ অনুযায়ী পুনঃইস্যুর আবেদন করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যাচাই শেষে নির্ধারিত ফি গ্রহণ করে লাইসেন্স পুনঃ ইস্যু বা প্রতিলিপি প্রদান করবেন। এ ছাড়া করাত-কলের স্থান পরিবর্তন করতে হলে নতুন করে লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে।

খসড়া বিধিমালায় করাত-কল স্থাপনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু দূরত্বসংক্রান্ত শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। সংরক্ষিত, রক্ষিত, অর্পিত বা অন্য যেকোনো সরকারি বনভূমির সীমানা থেকে পাঁচ কিলোমিটার এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে তিন কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে করাত-কল স্থাপন করা যাবে না। তবে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে এ শর্ত প্রযোজ্য হবে না।

এ ছাড়া সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিনোদন পার্ক, উদ্যান বা আবাসিক এলাকার কমপক্ষে ২০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে করাত-কল স্থাপন করা যাবে না। তবে বিধিমালা কার্যকর হওয়ার আগে নিষিদ্ধ এলাকায় যদি কোনো করাত-কল চালু থাকে, তা হলে মালিককে ১৮০ দিনের মধ্যে সেটি অন্যত্র স্থানান্তর করতে হবে। অন্যথায় কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে।

করাত-কল স্থাপনের জন্য নির্ধারিত জমির পরিমাণও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সাধারণ ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১০ শতাংশ জমি থাকতে হবে। তবে সিটি করপোরেশন এলাকায় অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ন্যূনতম তিন শতাংশ জমি থাকলেও লাইসেন্সের আবেদন করা যাবে। লিজ বা ভাড়ার জমির ক্ষেত্রে বৈধ চুক্তিপত্র ছাড়া লাইসেন্সের আবেদন গ্রহণ করা হবে না।

খসড়া বিধিমালায় করাত-কল পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধ্যতামূলক শর্তও উল্লেখ করা হয়েছে। সূর্যাস্তের পর থেকে সূর্যোদয়ের আগে (রাতে) পর্যন্ত করাত-কল পরিচালনা করা যাবে না। করাত-কলের নির্ধারিত জমির চারদিকে ঘেরা-বেড়া থাকতে হবে এবং সেই বেড়ার বাইরে গোলকাঠ, চিরাইকৃত বা অচিরাইকৃত কাঠ, কাঠের গুঁড়া বা গাছের বাকল রাখা যাবে না।

একই সাথে দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া করাত-কল পরিচালনা করা যাবে না। করাত-কল এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে এবং নিরাপত্তা প্রহরীর মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধ মানতে হবে এবং গাছের বাকল, কাঠের গুঁড়া বা অবশিষ্টাংশ কোনো খাল, নদী বা জলাশয়ে ফেলা যাবে না।

বিধিমালায় কাঠ ও অন্যান্য বনজদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় ও চিরাইয়ের হিসাব সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রত্যেক করাত-কল মালিককে ফরম ‘ঘ’ অনুযায়ী কাঠের উৎস উল্লেখ করে ক্রয়-বিক্রয় ও চিরাইয়ের হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রতি মাসে তা নিকটস্থ বন বিভাগীয় দফতরে জমা দিতে হবে। কোনো কর্মকর্তা পরিদর্শনের সময় এসব হিসাব দেখতে চাইলে তা প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক।

পরিদর্শনের সময় কোনো কর্মকর্তার কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে করাত-কলে অবৈধ কাঠ বা অন্য বনজদ্রব্য রয়েছে, অথবা বিধিমালার শর্ত লঙ্ঘন করা হয়েছে, তা হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অবৈধ কাঠ জব্দ করতে পারবেন এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো করাত-কল মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে তাকে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে।

এ ছাড়া লাইসেন্স ফি এলাকাভেদে নির্ধারণ করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় লাইসেন্স ফি ২৫ হাজার টাকা এবং পুনঃ ইস্যু ফি ১৫ হাজার টাকা। পৌরসভা এলাকা ও উপজেলা সদরের দুই কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে লাইসেন্স ফি ১৫ হাজার টাকা এবং পুনঃ ইস্যু ফি ১০ হাজার টাকা। অন্য এলাকায় লাইসেন্স ফি ১০ হাজার টাকা এবং পুনঃ ইস্যু ফি পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রস্তাবিত এই বিধিমালা কার্যকর হলে করাত-কল খাত আরো শৃঙ্খলার মধ্যে আসবে এবং অবৈধ কাঠ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বন সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।