পয়লা ফাল্গুনে ঝিনাইদহে ৫ কোটি টাকার ফুল বিক্রি

Printed Edition
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ফুল কিনছেন দুই তরুণী	 :  নয়া দিগন্ত
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ফুল কিনছেন দুই তরুণী : নয়া দিগন্ত

রুহুল আমিন সৌরভ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)

পয়লা ফাল্গুনকে কেন্দ্র করে ঝিনাইদহের ফুলের রাজ্যে ছিল উৎসবের আমেজ। বসন্তবরণের রঙিন আবহে জেলার দুই বৃহৎ পাইকারি ফুলবাজারÑ কালীগঞ্জের বালিয়াডাঙ্গা ও সদর উপজেলার গান্না বাজারÑ দুই দিন ধরে ছিল ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখর। ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি এই দুই বাজারে মিলিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বাজার কর্তৃপক্ষ।

দেশের মোট ফুল উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে ঝিনাইদহ থেকে। বিশেষ করে গাঁদা ফুল উৎপাদনে এ জেলার সুনাম দীর্ঘদিনের। এখানকার হলুদ ও কমলা রঙের গাঁদা ফুলের আকার বড়, রঙ উজ্জ্বল এবং স্থায়িত্ব বেশি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারদের কাছে ঝিনাইদহের ফুলের আলাদা কদর রয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা সরাসরি এ দুই বাজারে এসে ফুল সংগ্রহ করেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৪৮৯ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ফুলের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধা, জারবেরা, গ্লাডিওলাস, চন্দ্রমল্লিকা ও অন্যান্য মৌসুমি ফুল। বছরের বারো মাসই জেলার মাঠে মাঠে ফুটে থাকে রঙিন ফুল। তবে পয়লা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারি; এই তিনটি দিনকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি চাহিদা তৈরি হয়।

এবার উৎসবের ঠিক আগে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন উপলক্ষে একদিন গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় ফুল পরিবহন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। দূর-দূরান্তে ফুল পাঠাতে না পারলে দাম পড়ে যেতে পারে; এমন আশঙ্কা ছিল চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তবে ভোটের পরদিন থেকে পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ায় বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি। বরং ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি বাজারে ব্যাপক ভিড় লক্ষ করা যায়। পাইকারি বাজার থেকে ফুল কিনে তা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।

ব্যবসায়ীরা জানান, উৎসব ঘিরে গোলাপ ও জারবেরার চাহিদাই ছিল সবচেয়ে বেশি। ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি পাইকারি বাজারে একটি থাই গোলাপ বিক্রি হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে। খুচরা বাজারে লাল গোলাপের দাম উঠেছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত, যা কয়েক দিন আগেও ছিল ২৫ থেকে ৩৫ টাকা। হলুদ গোলাপ বিক্রি হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। জারবেরা ফুল পাইকারি বাজারে পাঁচ থেকে ছয় টাকা দরে বিক্রি হলেও খুচরা পর্যায়ে তা ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

রজনীগন্ধা বিক্রি হয়েছে পাঁচ থেকে সাত টাকা দরে। মাথার বেঁড়ি বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকায়, যা আগে ছিল ৭০ থেকে ১০০ টাকা। তবে গাঁদা ফুলের ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এক ঝোপা গাঁদা বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা। ফলে গাঁদা চাষিদের মধ্যে কিছুটা হতাশা দেখা গেছে। ব্যবসায়ীদের মতে, ভালোবাসা দিবসে গাঁদার তুলনায় গোলাপ, জারবেরা ও রজনীগন্ধার চাহিদা বেশি থাকায় গাঁদার দাম কিছুটা কমেছে।

গান্না ফুলবাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভ্যান ও সাইকেলের পেছনে সাজানো টাটকা ফুল নিয়ে ভোর থেকেই হাজির হয়েছেন চাষিরা। বাজারজুড়ে রঙিন ফুলের সমারোহ। কেউ দরদাম করছেন, কেউ ফুল গুছিয়ে ট্রাকে তুলছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকাররা সেরা মানের ফুল সংগ্রহে ব্যস্ত। বাজারভেদে গাঁদা ফুলের একগুচ্ছ ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, চায়না গোলাপ ২৫ থেকে ২৮ টাকা, রজনীগন্ধা সাত থেকে ১০ টাকা এবং জারবেরা পাঁচ থেকে ছয় টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

ফুলচাষি আব্দুল্লাহ বলেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। দাম কিছুটা কম হলেও বিক্রি ভালো হওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট। চাষি রহমান আলী বলেন, নির্বাচনের কারণে পরিবহন বন্ধ থাকায় দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজার ভালো গেছে। গাঁদার দাম কিছুটা কম হলেও অন্য ফুলে ক্ষতি পুষিয়ে গেছে। গান্না ফুলবাজারের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, সারা বছরই কমবেশি ফুল বিক্রি হয়। তবে পয়লা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। এবার দুই দিনে প্রায় তিন কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে।

অন্য দিকে বালিয়াডাঙ্গা ফুলবাজারের সভাপতি আলহাজ টিপু সুলতান জানান, নির্বাচনের কারণে প্রভাব পড়তে পারে; এমন ধারণা ছিল। কিন্তু বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি। এ বাজারে দুই দিনে প্রায় দুই কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কামরুজ্জামান বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪৮৯ হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। পয়লা বসন্ত, ভালোবাসা দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারি; এই সময়গুলোতে ফুলের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। এ বছর জাতীয় নির্বাচন হলেও বাজারে তার উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বলা যায়, বসন্ত উৎসব ঘিরে ঝিনাইদহের ফুলবাজারে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে। কয়েক দিনের ব্যস্ততায় স্বস্তির হাসি ফুটেছে চাষি ও ব্যবসায়ীদের মুখেও।