সূচকের অস্থির আচরণে হতাশা বাড়ছে পুঁজিবাজারে

কোম্পানি আইন সংশোধনে বাইব্যাক বিধি সংযুক্তির প্রস্তাব ডিবিএর

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন ঘটছেনা দেশের পুঁজিবাজারে। গতকাল লেনদেনের পুরোটা সময় জুড়েই ঢাকা শেয়ারবাজারে সূচকের আচরণ ছিল বেশ অস্থির। সূচকের উন্নতি দিয়ে লেনদেন হলেও মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বারবারই সৃষ্টি হচ্ছিল বিক্রয়চাপ। বেশ ক’বার এ চাপ সামলে সূচককে ঊর্ধ্বমুখী আচরণ করতে দেখা গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। সূচকের অবনতিতেই লেনদেন শেষ হয় পুঁজিবাজারটির। আর ডিএসই সূচকের এহেন আচরণে পুঁজিবাজারে হতাশা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রামের অবস্থা ছিল আরো খারাপ। এখানে সব ক’টি সূচকেরই বড় ধরনের অবনতি রেকর্ড করা হয়।

গত কয়েক দিনের মধ্যে পুঁজিবাজার পরিস্থিতির উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের বেশ কয়েকটি উদ্যোগ ছিল। কিন্তু এসব উদ্যোগ বাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে পারছে না। সাময়িকভাবে সূচকের উন্নতি ঘটলেও তা কোনোভাবেই টেকসই হচ্ছে না। বরাবরই বিক্রয়চাপে অস্থির আচরণ করছে বাজার সূচক, যা অনেক সময় আতঙ্কের পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। অথচ বাজারের মূল্যস্তর এমন অবস্থায় নেই যে এখান থেকে বিনিয়োগকারিরা মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারের প্রতি আস্থাহীনতার কারণেই তৈরি হচ্ছে এ বিক্রয়চাপ। তারা মনে করেন বাজারকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিলে এমনটি হয়তো ঘটত না। সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে অতিরিক্ত নজরদারির বিষয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, যা প্রকারান্তরে বাজারকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে বলে মনে করেন তারা।

বাজারের সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার বিনিয়োগকারীরাও বারবার একই অভিযোগ করে আসছেন। তারাও মনে করেন, বিভিন্ন ব্রোকার হাউজে ডিএসই কর্তৃক অতিরিক্ত নজরদারি সক্ষমতায় এগিয়ে থাকা বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে বিঘœ সৃষ্টি করে, যা তাদের বাজারের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করছে। আর এসব তথ্য মুহূর্তেই এক হাউজ থেকে অন্য হাউজে চলে যায়। এতে দ্রুত বিনিয়োগ তুলে নিতে তৎপর হন তারা। এসব কারণেই সম্প্রতি বাজারে বিক্রয়চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট হারায়। পাঁচ হাজার ৫৩৯ দশমিক ৩২ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল লেনদেন শেষে স্থির হয় পাঁচ হাজার ৫৩৭ দশমিক ৮৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচকটির ৫ দশমিক ২৯ পয়েন্ট অবনতি ঘটলেও ডিএসই শরিয়াহ ১ দশমিক ০১ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৫৯ দশমিক ০৬ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ১৪ হাজার ৯২৭ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি দিনশেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৮৬৮ দশমিক ৬০ পয়েন্টে। এখানে বিশেষায়িত দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৫৭ দশমিক ৯৭ ও ৪২ দশমিক ০১ পয়েন্ট।

সূচকের অস্থির আচরণের ফলে গতকাল ডিএসইর লেনদেনেও ভাটা পড়ে। বাজারটি গতকাল ৫১৯ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৭১ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৫৯০ কোটি টাকা। তবে লেনদেনের বড় উন্নতি ঘটে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। সিএসই গতকাল ৮৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে। তবে এখানে এককভাবে সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের লেনদেন ছিল ৭৪ কোটি টাকার বেশি।

এ দিকে দেশের পুঁজিবাজারকে আরো গতিশীল, কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব করতে প্রস্তাবিত কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর তৃতীয় সংশোধনীতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার বাইব্যাক এবং মার্জার ও অ্যাকুইজিশন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বিধান অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। এ বিষয়ে গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: আতাউর রহমান খান এনডিসির কাছে ডিবিএর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি লিখিত সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। একইসাথে বিষয়টি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খানকেও এর অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

ডিবিএর সুপারিশে বলা হয়েছে, দেশের পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য নিজস্ব শেয়ার বাইব্যাকের আইনগত সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে প্রস্তাবিত কোম্পানি আইন সংশোধনে প্রয়োজনীয় বিধান অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি শেয়ার বাইব্যাকের ক্ষেত্রে বিধি ও প্রবিধান প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, তদারকি, মনিটরিং এবং সুশাসন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ক্ষমতা বিএসইসিকে দেয়ার প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি।

একইভাবে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির মার্জার ও অ্যাকুইজিশন কার্যক্রমে বিদ্যমান জটিলতা এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া পরিহারের লক্ষ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিধি ও প্রবিধান প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা বিএসইসিকে দেয়ার সুপারিশ করেছে ডিবিএ।

ডিবিএ মনে করে, পুঁজিবাজার ও তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বিএসইসি সংশ্লিষ্ট স্ট্যাটুটরি রেগুলেটরি অথরিটি হওয়ায় শেয়ার বাইব্যাক এবং মার্জার-অ্যাকুইজিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়নের ক্ষমতা কমিশনের হাতে থাকা প্রয়োজন। এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা সহজ হবে।

সংগঠনটির মতে, এসব বিষয়ে আধুনিক ও কার্যকর বিধিবিধান প্রণয়ন করা হলে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট পুনর্গঠন ও মূলধন ব্যবস্থাপনা আরো সহজ ও কার্যকর হবে। একই সাথে পুঁজিবাজারে গতিশীলতা বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনের স্বার্থ আরো সুরক্ষিত হবে। ডিবিএ আশা করছে, পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের গৃহীত উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, বাজারের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর তৃতীয় সংশোধনীতে ডিবিএর সুপারিশগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হবে।