বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহারে বাড়বে সুতার আমদানি খরচ

শাহ আলম নূর
Printed Edition

দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরী পোশাকশিল্পে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে সুতা আমদানিতে বন্ডসুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাব। দীর্ঘদিন ধরে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে আসা নিটওয়্যার কারখানাগুলো এখন বাড়তি করের বোঝায় পড়ার শঙ্কায় রয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে রফতানি আয়, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তারা বলছেন, ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে রফতানিমুখী নিটওয়্যার খাতে সুতার আমদানি খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ফলে তৈরী পোশাক শিল্পের উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত গভীর সঙ্কটে পড়বে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় গত ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা বন্ডসুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করে। সরকারের যুক্তি দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোকে সুরক্ষা দেয়া এবং স্থানীয় সুতার ব্যবহার বাড়ানো। কিন্তু রফতানিমুখী পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে কাঁচামাল সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেবে, যা সামাল দেয়া কঠিন হবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে এইচএস কোড ৫২০৫ ও ৫২০৬-এর সুতার ওপর। এসব সুতা দেশের নিট ও ওভেন উভয় ধরনের পোশাক উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। প্রস্তাব কার্যকর হলে এইচএস কোড ৫২০৫-এর কটন সুতায় আমদানিকারকদের ১০ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম শুল্ক দিতে হবে। এতে মোট করহার দাঁড়াবে প্রায় ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে এইচএস কোড ৫২০৬ ও সমজাতীয় সুতার ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর ও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর মিলিয়ে মোট শুল্কহার হবে ৩৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

বর্তমানে বন্ডসুবিধার কারণে রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো শুল্কমুক্তভাবে সুতা আমদানি করতে পারে এবং পণ্য রফতানির পর হিসাব সমন্বয় করে। এ ব্যবস্থার ফলে উদ্যোক্তাদের নগদ অর্থের ওপর চাপ পড়ে না এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয়। কিন্তু সুবিধা প্রত্যাহার হলে আমদানির সময়ই বিপুল পরিমাণ কর পরিশোধ করতে হবে, যা ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুতা নিটওয়্যার শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। এর দাম বেড়ে গেলে প্রতিটি ধাপে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে ডাইং, নিটিং, ফিনিশিং থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পণ্য প্রস্তুত পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সাধারণত নির্দিষ্ট দামে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে থাকে। হঠাৎ করে মূল্য বেড়ে গেলে তারা সেই ব্যয় বহন করবে না; বরং অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নেবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম বলেন, এমনিতেই বৈশ্বিক মন্দা, জ্বালানি সঙ্কট, ডলার সঙ্কট এবং ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণে বাংলাদেশের পোশাক খাত চাপে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে রফতানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ অবস্থায় বন্ডসুবিধা প্রত্যাহার করলে সঙ্কট আরো তীব্র হবে এবং অনেক কারখানা টিকে থাকতে পারবে না।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, তৈরী পোশাক খাত দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয় এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা এর সাথে যুক্ত। বন্ডসুবিধা প্রত্যাহার শুধু একটি নীতিগত পরিবর্তন নয়, এটি পুরো রফতানি কাঠামোর ওপর আঘাত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধি অনুসরণ করেই এত দিন কাঁচামাল হিসেবে সুতা বন্ডসুবিধায় আমদানি হয়ে আসছে, যা বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার অন্যতম ভিত্তি।

তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে কাঁচামাল সরবরাহে গুরুতর বিঘœ ঘটবে। সময়মতো সুতা পাওয়া যাবে না, উৎপাদন পরিকল্পনা ভেঙে পড়বে এবং পণ্যের মূল্য বেড়ে যাবে। ক্রেতা নিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ এ বাড়তি ব্যয় চাপিয়ে দিতে পারবে না। ফলে অর্ডার ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশে চলে যাবে।

রফতানিকারকদের মতে, স্থানীয় স্পিনিং মিলের উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে দেশের সব ধরনের চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। বিশেষ করে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের অনেক ধরনের বিশেষায়িত সুতা স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত মানে তৈরি হয় না। তাই আমদানির ওপর নির্ভরতা অনিবার্য। এ বাস্তবতা উপেক্ষা করে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে পুরো পোশাকশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানি হয়েছে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছর ছিল ৩৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে নিটওয়্যার রফতানি ২০ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ এ খাতের অবদান ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ওভেন পোশাক রফতানি হয়েছে ১৮ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলার, যা মোটের ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ। পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে নিট খাত এখন বাংলাদেশের পোশাক রফতানি প্রধান চালিকাশক্তি, আর এই খাতেই প্রস্তাবিত সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

উদ্যোক্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ এমনিতেই নানামুখী চাপে রয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, নতুন শুল্কনীতি, জাহাজভাড়া বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মুনাফার হার অনেক কমে গেছে। এর মধ্যে নতুন করে ৩০-৪০ শতাংশ করভার যোগ হলে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়ে যাবে।

ইতোমধ্যে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ যৌথভাবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের কাছে চিঠি দিয়ে সিদ্ধান্তটি বাতিলের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনগুলোর বক্তব্য বন্ডসুবিধা কোনো বিশেষ প্রণোদনা নয়; এটি রফতানিমুখী শিল্পের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ব্যবস্থা। ভারত, ভিয়েতনাম, চীনসহ প্রতিযোগী সব দেশেই এ ধরনের সুবিধা চালু রয়েছে। বাংলাদেশ তা প্রত্যাহার করলে বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজস্ব আদায়ের স্বল্পমেয়াদি চিন্তা থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি আরো বড় হবে। পোশাক খাত দুর্বল হলে রফতানি আয় কমবে, কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিই ঝুঁকিতে পড়বে।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, স্থানীয় স্পিনিং শিল্পকে সহায়তা দিতে হলে আলাদা নীতিগত সহায়তা দেয়া যেতে পারে, রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক আরোপ সমাধান নয়। দুই খাতের স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

উদ্যোক্তারা দ্রুত এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের পোশাক খাত বহু বছর ধরে কঠোর পরিশ্রমে বিশ্ববাজারে অবস্থান তৈরি করেছে। একটি ভুল নীতির কারণে সেই অর্জন নষ্ট হয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। তাই জাতীয় স্বার্থেই বন্ডসুবিধা বহাল রাখা জরুরি।