ইরান পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে সৌদিসহ বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো

মধ্যপ্রাচ্য অশান্ত হলে সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মী ও রেমিট্যান্সে

মনির হোসেন
Printed Edition

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দেশ ইরানে সরকারবিরোধী ব্যাপক আন্দোলন শুরু হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাক, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, জর্দান, ওমান, বাহরাইন ও লেবাননসহ শ্রমবান্ধব দেশগুলো টালমাটাল হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে এসব দেশে থাকা প্রায় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশীর মধ্যে একধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। না জানি কখন কী হয়? যদিও এখন পর্যন্ত এসব দেশে যুদ্ধ শুরু হওয়ার মতো কোনো ধরনের প্রভাবই পড়েনি বলে জানিয়েছেন দেশগুলোতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও এই পেশার সাথে সম্পৃক্ত বিশ্লেষকরা। তবে তারা কিছুটা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, যদি পরিস্থিতি অস্থিতিশীল অথবা অশান্ত হয়েই ওঠে, তাহলে কিন্তু প্রথম ধাক্কাই আসতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ শ্রমবাজার সৌদিসহ অন্যান্য দেশের শ্রমবাজারের ওপর। আর সরাসরি এর প্রভাব পড়বে সরকারি চ্যানেলে দেশে পাঠানো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্সের ওপর।

যদিও তারা সে দিকটায় না গিয়ে এখনো আশাবাদ ব্যক্ত করে বলছেন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কিন্তু পৃথিবীর বড় বড় রাষ্ট্রের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। তাই শেষ মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা না-ও হতে পারে। তার পরও যেহেতু পরিস্থিতি এ মুহূর্তে টালমাটাল, সে ক্ষেত্রে ইরানের সরকারের ওপর বড় রাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং সেই প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের কোন কোন দেশে পড়ে, সেগুলোর ওপরই বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো কঠোর নজরদারি রাখতে শুরু করেছে বলে দূতাবাস সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন।

গতকাল সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের একাধিক কর্মকর্তা প্রথমে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করলেও পরে তারা নাম না বলার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত ইরানের অভ্যন্তরে কী হচ্ছে তার আপডেট খোঁজখবর নিচ্ছি। তবে ঘটনা যে দিকেই যাক, আমাদের শ্রমবাজারের ওপর খুব বেশি প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছি।

তাদের মতে, যদি যুদ্ধ শুরু হয়েই যায় সে ক্ষেত্রে ইরান থেকে ইরাকসহ সীমান্ত লাগোয়া দেশে কিছু মানুষ ঢুকে পড়বে। ইরাক যুদ্ধের সময় প্রচুর লোক সৌদি আরবে ঢুকেছিল। এবারের চিত্র অবশ্য ভিন্ন। তা ছাড়া ইচ্ছা করলেই কেউ সৌদি আরবে ঢুকতে পারবে না। কারণ এখানকার সিকিউরিটি ব্যবস্থা অনেক শক্ত। এর মধ্যে ইরানও ইসরাইল এবং তার অনুসারীদের মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে সৈন্য রয়েছে সেখানে হামলা করবে বলে হুমকি দিয়েছে। তার পরও সৌদি আরবে হামলা হওয়ার সম্ভাবনা মোটেও নেই বলে আমরা মনে করছি। এর যথেষ্ট কারণও রয়েছে। তারা বলেন, সৌদি আরব সরকার ২০৩০ সালের ভিশন ঘোষণা করেছে। এই সালে তারা ওয়ার্ল্ড এক্সপো আয়োজন করবে। আবার ২০৩৪ সালে ওয়ার্ল্ড কাপ খেলার আয়োজন করবে। প্রতি বছর সারা বিশ্ব থেকে তারা এক কোটি হজযাত্রী আনার টার্গেট নিয়েছে, ট্রান্সপোর্ট, রিয়েল এস্টেট বিজনেট, ট্যুরিজম বিজনেসের ওপর জোর দিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে চায়নারও স্বার্থ রয়েছে। এ মুহূর্তে সারা পৃথিবী তাদের কাছ থেকে তেল কিনছে। এত বিপুল বিনিয়োগের দেশে ইচ্ছা করলেই অস্থিতিশীল করার আশঙ্কা আমরা দেখছি না। এটি হবে না বলে আমরা বিশ্বাস করি।

এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক কর্মী আসছে। তারা দেশে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে সাত লাখ ৫১ হাজার কর্মী সৌদি আরবে কাজ করতে এসেছেন। একমাত্র সৌদি আরবেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক কর্মী আসছেন।

পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা বলেন, ২০২৪ সালে সৌদি আরব থেকে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠানো হয়েছে। ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.৮ বিলিয়ন। ইরান পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশীদের উদ্দেশ্য দূতাবাস থেকে কোনো বার্তা দেয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তারা নয়া দিগন্তকে বলেন, এ মুহূর্তে সৌদি আরবে যুদ্ধের কোনো প্রভাবই তো পড়েনি। তাই এ ব্যাপারে তাদেরকে আমরা কী মেসেজ দিতে পারি। তবে আমরা ইরানের ঘটনাবলির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছি। মধ্যপ্রাচ্য বলতে তো শুধু কিন্তু আমরা না, এই বেল্টে রয়েছে বাহরাইন, ওমান, জর্দান, কুয়েত, কাতার, লেবানন, ইরাকসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র।

গতকাল অভিবাসন বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ সরকারের সাবেক একজন সচিব নয়া দিগন্তকে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কিন্তু ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) রয়েছে প্রচুর। তারা এসব দেশে ফ্যাক্টরি করার অর্থ হচ্ছে সস্তা এনার্জি পায়, কম দামে গ্যাস পায়। এসব কোম্পানিতেই কাজ করছে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কর্মী। কোনো কারণে যুদ্ধ শুরু হলে সবার আগে এসব কোম্পানিতেই বেশি প্রভাব পড়বে। তখন ইরান থেকে বিতাড়িত হয়ে ইরাক এবং আশপাশের অনেক দেশে অনেক লোক ঢুকবে। তখন পরিস্থিতির কারণে অনেক বাংলাদেশী কর্মীর চাকরি চলে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধের সবচেয়ে বড় খাত বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্সের ওপরও সরাসরি প্রভাব পড়বে।

গতকাল সোমবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মিশন ও কল্যাণ অনুবিভাগ (সংযুক্ত) এর যুগ্মসচিব মাহমুদুর রহমান এর সাথে যোগাযোগ করলে তাকে পাওয়া যায়নি। ওই মিশন শাখার একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, মিশন প্রধান (যুগ্মসচিব) বর্তমানে সাভারে ট্রেনিংয়ে রয়েছেন। তবে ইরানের বাংলাদেশ দূতাবাসে আমাদের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের কোনো শাখা নেই। কারণ বাংলাদেশ থেকে ইরানে কর্মসংস্থানের জন্য কোনো কর্মী যায় না। তবে দেশটিতে পড়াশোনার জন্য স্টুডেন্টসহ অন্যান্য পেশার লোক যায়। তারা কী অবস্থায় আছে সেই বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে।

এর আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসির গতকালকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের শহরগুলোতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসার পর ইরানি কর্তৃপক্ষ দমনপীড়ন চালালে বিক্ষোভকারীদের সহযোগিতায় দাঁড়াতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানি কর্তৃপক্ষ এর জবাবে ওই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ও সহযোগীদের ওপর হামলার হুমকি দিয়েছে। সুতরাং এই বিক্ষোভ এবং এর বিরুদ্ধে ইরান সরকারের প্রতিক্রিয়া আগেরগুলোর চেয়ে কতটুকু আলাদা? প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ইরান এর আগেও অনেক বিক্ষোভ দেখেছে। নির্বাচনের কারচুপির অভিযোগ করে ২০০৯ সালের কথিত গ্রিন মুভমেন্টে নেতৃত্ব দিয়েছিল মধ্যবিত্তরা। তখন সেটি সীমাবদ্ধ ছিল বড় শহরগুলোতেই। আর ২০১৭ ও ২০১৯ সালের আন্দোলন ছিল গরিব এলাকাগুলোতে। এবারের সাথে তুলনা করার মতো আন্দোলন গড়ে ওঠেছিল ২০২২ সালে নিরাপত্তা হেফাজতে মাহশা আমিনের মৃত্যুর পর। হিজাব না পড়ায় দেশটির নৈতিকতা পুলিশ তাকে আটক করেছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ওই মৃত্যুর ঘটনার ছয় দিন পর গিয়ে আন্দোলন তখন তুঙ্গে উঠেছিল। এর বিপরীতে এবারের বিক্ষোভকে আরো ব্যাপক মনে হচ্ছে, যা ২৮ ডিসেম্বর শুরুর পর থেকে ক্রমেই আরো বড় হচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া আন্দোলনের ইস্যু মনে হচ্ছিল অর্থনৈতিক কিন্তু অল্প সময়েরই মধ্যেই এটি সবার জন্য অভিন্ন দাবিতে রূপ নিয়েছে- বলছিলেন খোরসান্দফার। ডলারের সাথে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের বিনিময় হারকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বরের শেষ দিকে বাজার ব্যবসায়ীরা তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ধর্মঘট শুরু করে। বিক্ষোভ দ্রুতই দেশটির তুলনামূলক গরিব পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

বিবিসির প্রতিবেদন মোতাবেক, এবারের বিক্ষোভের আরেকটি ফ্যাক্টর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে হোয়াইট হাউজের সমর্থন অনেকটা প্রকাশ্যে। ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করে হামলার হুমকি দিয়েছেন, যা আগে কখনোই হয়নি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন বিক্ষোভকারীরা ইরানের শত্রুদের দ্বারা পরিচালিত।