নতুন বিদেশী বিনিয়োগে ভাটা পুনঃবিনিয়োগে ভরসা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) চিত্রে এক ধরনের দ্বৈত প্রবণতা দেখা দিয়েছে। নতুন বিদেশী মূলধন ও আন্তঃকোম্পানি ঋণের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও দেশে ইতোমধ্যে কার্যরত বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনঃবিনিয়োগ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ-এফআইইডি ম্যানেজমেন্ট সেলের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নিট এফডিআই দাঁড়িয়েছে ৪৪৭.৩১ মিলিয়ন ডলার। আগের প্রান্তিক অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৫-এ যা ছিল ৩৭০.২৫ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে নিট এফডিআই বেড়েছে ২০.৮১ শতাংশ। তবে এক বছর আগের একই প্রান্তিকের তুলনায় সামগ্রিক নিট প্রবাহ কমেছে ৪৩.৮৫ শতাংশ। ফলে সাময়িক ঘুরে দাঁড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে চাপের ইঙ্গিতও স্পষ্ট।

নতুন বিনিয়োগে বড় ধাক্কা

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তন দেখা গেছে ইকুইটি মূলধনে। জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬-এ নিট ইকুইটি প্রবাহ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭৮.২৬ মিলিয়ন ডলার। আগের প্রান্তিকে এটি ছিল ১০৮.৩৪ মিলিয়ন ডলার। ফলে প্রান্তিকভিত্তিক কমেছে ২৭.৭৭ শতাংশ।

একই খাতে গত বছরের জানুয়ারি-মার্চে নিট প্রবাহ ছিল ২৬৩.৮৭ মিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে তা কমেছে ৭০.৩৪ শতাংশ।

আরো বড় পতন হয়েছে আন্তঃকোম্পানি ঋণে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চে এই খাতে নিট প্রবাহ ছিল ৩৪১.৪৮ মিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা নেমে এসেছে মাত্র ২৬.১৩ মিলিয়ন ডলারে এক বছরে পতন ৯২.৩৫ শতাংশ।

এটি ইঙ্গিত করে, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিদ্যমান কার্যক্রম ধরে রাখার প্রবণতা থাকলেও নতুন মূলধন সম্প্রসারণ এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক অর্থায়নে সতর্কতা বেড়েছে।

বিপরীত চিত্র পুনঃবিনিয়োগে

এফডিআইয়ের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো পুনঃবিনিয়োগ। জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬-এ বিদেশী কোম্পানিগুলোর পুনঃবিনিয়োগের নিট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪২.৯২ মিলিয়ন ডলার। আগের প্রান্তিকে ছিল ২১০.৭৪ মিলিয়ন ডলার। ফলে মাত্র এক প্রান্তিকে পুনঃবিনিয়োগ বেড়েছে ৬২.৭২ শতাংশ। একই সাথে ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চের ১৯১.২২ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় এক বছরে বেড়েছে ৭৯.৩৩ শতাংশ।

অর্থাৎ নতুন বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমলেও দেশে আগে থেকেই ব্যবসা করা বহুজাতিক ও বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আয়ের একটি বড় অংশ বাংলাদেশেই পুনরায় বিনিয়োগ করছে। এটি বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের আস্থার একটি ইতিবাচক সঙ্কেত হিসেবে দেখা যেতে পারে।

সংখ্যার আড়ালে যে বার্তা

এফডিআইয়ের সামগ্রিক পরিমাণ দেখলে শুধু ‘বৃদ্ধি’ বা ‘পতন’ দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে মোট নিট প্রবাহ আগের প্রান্তিকের তুলনায় বেড়েছে মূলত পুনঃবিনিয়োগের শক্তিশালী বৃদ্ধির কারণে।

অন্য দিকে নতুন ইকুইটি এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। পুনঃবিনিয়োগ সাধারণত এমন প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত, যারা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বাজার, অবকাঠামো, শ্রমবাজার ও ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে জানে। কিন্তু নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ আসে এমন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে, যারা দেশের ঝুঁকি, নীতি স্থিতিশীলতা, করব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের সুযোগ সবকিছু নতুন করে মূল্যায়ন করে।

তাই পুনঃবিনিয়োগ বাড়াকে ইতিবাচক সঙ্কেত হিসেবে দেখা গেলেও এটিকে নতুন বিদেশী বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

কেন নতুন বিনিয়োগে সতর্কতা?

বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক পরিবেশও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের ক্ষেত্রে নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর স্থিতিশীলতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, জমি ও অবকাঠামোগত জটিলতা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা, কর ও শুল্ক কাঠামোর পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এসব বিষয় বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

ফলে শুধু কর-সুবিধা বা বিনিয়োগ সম্মেলনের মাধ্যমে এফডিআই বাড়ানো সম্ভব নয়। বিনিয়োগের পুরো জীবনচক্রকে সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য করতে হবে।

তিনটি সূচকে তিন ধরনের বার্তা

সর্বশেষ তথ্যকে তিনটি সূচকে ভাগ করলে বাংলাদেশের এফডিআই পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়- প্রথমত, ইকুইটি : নতুন বিদেশী মূলধন প্রবাহ দুর্বল। এক বছরে নিট ইকুইটি ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে। দ্বিতীয়ত, আন্তঃকোম্পানি ঋণ : এই খাতে পতন আরো তীব্র। এক বছরে নিট প্রবাহ কমেছে ৯২ শতাংশের বেশি। তৃতীয়ত, পুনঃবিনিয়োগ : একই সময়ে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের পুনঃবিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৭৯ শতাংশ।

এই তিনটি প্রবণতা মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে বিদ্যমান বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি; কিন্তু নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে।

সংখ্যায় এফডিআই

জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ নিট এফডিআই : ৪৪৭.৩১ মিলিয়ন ডলার; আগের প্রান্তিকের তুলনায় বৃদ্ধি : ২০.৮১%; এক বছরের ব্যবধানে মোট নিট এফডিআই: -৪৩.৮৫%; নিট ইকুইটি: ৭৮.২৬ মিলিয়ন ডলার; নিট পুনঃবিনিয়োগ : ৩৪২.৯২ মিলিয়ন ডলার; নিট আন্তঃকোম্পানি ঋণ : ২৬.১৩ মিলিয়ন ডলার; এক বছরে পুনঃবিনিয়োগ বৃদ্ধি: ৭৯.৩৩%; এক বছরে ইকুইটি পতন : ৭০.৩৪%; এক বছরে আন্তঃকোম্পানি ঋণ পতন : ৯২.৩৫%।

সামনে করণীয়

নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত পুনঃবিনিয়োগের ইতিবাচক প্রবণতাকে ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনা।

এজন্য বিনিয়োগ অনুমোদন ও ব্যবসা নিবন্ধনের প্রক্রিয়া আরো দ্রুত করা, কর ও শুল্ক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা, মুনাফা ও মূলধন প্রত্যাবাসন সহজ করা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানো জরুরি।

একই সাথে বিনিয়োগ-পরবর্তী সেবা বা ধভঃবৎপধৎব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ দেশে থাকা বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনঃবিনিয়োগ শুধু তাদের আস্থার পরিমাপক নয়; ভবিষ্যৎ নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছেও এটি বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত।

সারকথা : বাংলাদেশের এফডিআই এখন ‘নতুন বিনিয়োগের প্রবাহে’ নয়, বরং ‘বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখার সক্ষমতায়’ বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। পুনঃবিনিয়োগের উল্লম্ফন স্বস্তির খবর হলেও নতুন ইকুইটি ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশী মূলধনের পতন বিনিয়োগ পরিবেশের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাই সামনে এনেছে।