আলি জামশেদ বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ
হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে ও শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। মাঠে কাজ করতে গিয়ে আকস্মিক বজ্রপাতের আঘাতে প্রাণহানির একের পর এক ঘটনা স্থানীয় জনগণের মধ্যে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রতিরোধমূলক স্থায়ী অবকাঠামো ও সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
গত ১০ এপ্রিল নিকলী উপজেলার সিংপুর ইউনিয়নের ডুবি গ্রামের বরবান্দ এলাকায় ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত থাকার সময় মতিউর রহমান (৬৫) বজ্রপাতে নিহত হন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন ঘটনা হাওরাঞ্চলে প্রায়ই ঘটছে। মাঠে কাজ করা অবস্থায় আকস্মিক ঝড়ো আবহাওয়া দেখা দিলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আকাশ কালো হলে এবং বিদ্যুৎ চমকালেই কৃষকরা নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েন।
স্থানীয় বিভিন্ন মহল অভিযোগ করছে, বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগের অভাব রয়েছে। হাওর এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত বজ্রনিরোধক টাওয়ার, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বা মাল্টিপারপাস শেড গড়ে ওঠেনি। ফলে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। সরকারি উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও বাস্তবায়নে ধীরগতি ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
আবহাওয়া অফিসের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতের ঝুঁকি বেশি এবং বিষয়টি সম্পর্কে তারা অবগত। তবে প্রতিরোধমূলক কাঠামোগত ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের। এ বিষয়ে দফতরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়।
বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক সমস্যা হাওরবাসীর আরেকটি বড় সঙ্কট। ঝড়-বৃষ্টির সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যা মোবাইল নেটওয়ার্ক ও জরুরি যোগাযোগব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের একাধিক সূত্র জানায়, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ সীমিত থাকায় লোডশেডিং পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং বৈরী আবহাওয়ায় সমস্যা আরো বাড়ে। একইভাবে নেটওয়ার্ক কোম্পানিগুলোও জানায়, বিদ্যুৎ দীর্ঘ সময় না থাকলে ব্যাকআপ ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। ফলে জরুরি সতর্কবার্তা প্রচারেও ব্যাঘাত ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টাওয়ার নির্মাণ যথেষ্ট নয়; বরং সমন্বিত ঝুঁকি হ্রাস পরিকল্পনা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে- মাল্টিপারপাস আশ্রয়কেন্দ্র, মাঠপর্যায়ে সাইরেন ব্যবস্থা, আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত প্রচার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, গাছের নিচে বা পানির কাছাকাছি অবস্থান না করার বিষয়েও সচেতনতা জরুরি।
সরকারি ও বেসরকারি তথ্যে দেখা যায়, গত এক দশকে দেশে হাজার হাজার মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে হাওর ও কৃষিপ্রধান জেলাগুলোতে মৃত্যুর হার বেশি। চলতি বছরেও একাধিক ঘটনায় হাওরাঞ্চলে প্রাণহানি ঘটেছে। গবেষকদের ধারণা, জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বায়ুদূষণের কারণে বজ্রপাতের প্রবণতা বাড়ছে।
হাওরবাসীর অভিযোগ, প্রতিরোধক অবকাঠামো না থাকায় কৃষক-শ্রমিক ও জেলেরা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে চরম আর্থিক ও মানসিক সঙ্কটে পড়েছে। মাঠে কাজের সময় বজ্রপাতের শব্দ শুনলেই অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।
নিকলী উপজেলার ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন, কটিয়াদী উপজেলার ব্যবসায়ী নুরুজ্জামান মামুন, বাজিতপুরের গণমাধ্যমকর্মী রফিকুল ইসলাম, নিকলীর আলমগীর হোসেন এবং অষ্টগ্রামে কর্মরত পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের আ: ছাত্তারসহ স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে হাওরাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ স্থবির হয়ে পড়ে। তাদের মতে, হাওর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক কম ও অনিয়মিত হওয়ায় মোবাইল সেবা ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রমে ঘন ঘন বিঘœ ঘটে। এতে জরুরি যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জেনারেটর চালু রাখার নির্দেশনা রয়েছে। সাধারণত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ব্যাকআপে নেটওয়ার্ক সচল রাখার কথা বলা হয়। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে নেটওয়ার্কে সমস্যা দেখা দেয়া স্বাভাবিক বলে তারা উল্লেখ করেন। তবে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী ব্যাকআপ ব্যবস্থা সচল না রাখলে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয় এবং সে ক্ষেত্রে গ্রাহক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুযোগও থাকে বলে জানা যায়।
নিকলী উপজেলার সিনিয়র অবজারভার আক্তার ফারুক বলেন, হাওরে বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ ব্যয়বহুল হলেও প্রায় তিন বছর আগে মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণের একটি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কেন সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি, তা তার কাছে স্পষ্ট নয়। তবে তিনি হাওরের কৃষক, শ্রমিক ও জেলে- বিশেষ করে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
হাওর গবেষক হিসেবে পরিচিত, বাংলাদেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম বলেন, বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল- এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। তার মতে, বিদেশী প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বুয়েটের মতো কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করলে স্থানীয় সক্ষমতার মাধ্যমে কার্যকর সমাধান তৈরি সম্ভব। তিনি আরো বলেন, ঢাকায় গ্রাউন্ডিং বা আর্থিং ব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো থাকায় ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কম হয়। একই ধরনের আধুনিক ও উঁচু টাওয়ারভিত্তিক সুরক্ষাব্যবস্থা হাওরাঞ্চলে চালু করা গেলে বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাস পেতে পারে। পাশাপাশি মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণ হলে কৃষক ও শ্রমিকরা তাৎক্ষণিকভাবে আশ্রয় নিতে পারবেন, যা প্রাণহানি কমাতে সহায়ক হবে বলে তার অভিমত।
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের সাথে ১০ মে নিকলীতে বজ্রপাতে নিহতের ঘটনাসহ সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা হলে তিনি জানান, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ দ্রুত নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকায় অনুষ্ঠিত একাধিক সমন্বয় সভায় সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও অন্যান্য হাওর জেলার জন্য আশ্রয় প্রকল্পের শেড নির্মাণের পাশাপাশি বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শাখার সাথে সমন্বয়ের পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার পরিচালক জানান, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে বজ্রপাতে মোট তিন হাজার ৭২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরো জানান, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৮৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন এবং বলেন, হাওরাঞ্চলে ঝুঁকি হ্রাসে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে।



