- জমা পড়ে আছে ৭০ হাজার শিক্ষকের আবেদন
- আওয়ামী আমলে লুটপাটে ‘অবসর সুবিধা বোর্ডে’ অচলাবস্থা
- ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির আগে সমাধান হচ্ছে না
অবসরে যাওয়া বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য জীবন এখন এক গভীর অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের নাম। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে নির্দিষ্ট বয়সে অবসরে যাওয়ার পর যেসব আর্থিক সুবিধা পাওয়ার কথা, তা পেতে বছরের পর বছর ধরনা দিতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দফতরে। নিজস্ব কোনো আয় না থাকায় পরিবার-পরিজন ও অসুস্থ শরীর নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন হাজারো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী। চিকিৎসার অভাবে অনেকেই ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার আগেই পৃথিবী ছাড়ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে অনিয়ম ও লুটপাটের যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তার রেশ এখনো কাটেনি। সেই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেই কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে বোর্ড। ফলে অবসর সুবিধাপ্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি আদালতের নির্দেশে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির আগে অবসর সুবিধাসংক্রান্ত নতুন কোনো সেবা শিক্ষকরা পাবেন না। এর ফলে ২০২১ সালের পর অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের আবেদনের ভবিষ্যৎ আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে প্রায় এক লাখ আবেদন ঝুলে আছে, যার বড় অংশই গত চার বছরে জমা পড়া।
অবসর সুবিধা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, গত এক মাস ধরে বোর্ডের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পর্যন্ত এই স্থবিরতা চলবে। বর্তমানে বোর্ডে প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর আর্থিক আবেদন জমা রয়েছে। তবে শুধু ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের আবেদন নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। এর পরের আবেদনগুলো আপাতত বিবেচনার বাইরে থাকছে। এতে হাজার হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী চরম বিপাকে পড়েছেন।
অবসরে যাওয়ার সাথে সাথেই তাদের নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে যায়। অথচ প্রাপ্য অর্থ না পাওয়ায় অনেকে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে কারিগরি সমস্যা। চলতি বছরে প্রায় চার মাস অবসর বোর্ডের অনলাইন সার্ভার বন্ধ থাকায় বহু শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে গিয়েও নির্ধারিত সময়ে আবেদন জমা দিতে পারেননি। অন্যদিকে ভুয়া ইনডেক্স, জাল আবেদন ও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে একটি চক্র শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী অবসর সুবিধার অর্থ ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করার কথা। কিন্তু তহবিল সঙ্কট, প্রশাসনিক জটিলতা ও কারিগরি সমস্যার কারণে বাস্তবে তিন থেকে চার বছর, এমনকি তারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ অপেক্ষায় অনেকে মারা গেছেন, অনেকে ক্যান্সারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশেষ ও এককালীন বড় বরাদ্দ ছাড়া এই সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ। তাদের অবসর সুবিধা দেয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড। চাকরিরত অবস্থায় শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ প্রতি মাসে কেটে রাখা হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা নেয়া হয়, যার ৭০ টাকা অবসর তহবিলে জমা হয়। সরকার ও তহবিলের সুদের অর্থ মিলিয়ে অবসর সুবিধা দেয়া হয়।
বোর্ড সূত্র জানায়, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কাটা ৬ শতাংশের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা আদায় হয়। এফডিআর থেকে মাসে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা লভ্যাংশ আসে। সব মিলিয়ে বছরে আয় প্রায় ৯৬০ কোটি টাকা। অথচ প্রতি বছর গড়ে ১৫ হাজার অবসর আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন হয় প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ফলে বছরে গড়ে ৫৪০ কোটি টাকার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত অবসর সুবিধার আবেদন জমা ছিল ৬৪ হাজার ৭৭৫টি, যা বর্তমানে বেড়ে প্রায় ৭০ হাজারে পৌঁছেছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন প্রায় সাত হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যেই আদালতের নির্দেশে সচিবের রুটিন দায়িত্ব স্থগিত থাকায় ২৩ নভেম্বর থেকে তিন মাস বোর্ডের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ১২ নভেম্বর শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধার অর্থ বরাদ্দ চেয়ে একটি আধা সরকারি পত্র পাঠিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, তহবিল ঘাটতির কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী অবসর ও কল্যাণ সুবিধা পাচ্ছেন না এবং অনেকেই প্রাপ্য সুবিধা পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করছেন, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
এ বিষয়ে অবসর সুবিধা বোর্ডের সদস্যসচিব অধ্যাপক মো: জাফর আহম্মদ গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বোর্ডে অচলাবস্থা তৈরি হয়। একটি চক্র বোর্ডকে কার্যত ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি ছয় হাজার ৩৪৮টি আবেদন নিষ্পত্তি করে ৬৭৪ কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন। তবে বর্তমানে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অবসর সুবিধা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের ভাষ্য, শেষ বয়সে চিকিৎসাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। কিন্তু টাকার অভাবে সেই চিকিৎসাটুকুও মিলছে না। গড়ে একজন শিক্ষক ১২ লাখ টাকা এবং একজন কর্মচারী ছয় লাখ টাকা অবসর সুবিধা পান। কলেজের অধ্যক্ষরা সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পান। এই ব্যবস্থায় টেকসই সমাধান না এলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দুর্ভোগ আরো বাড়বে বলেই আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।



