ক্রিকেটের রঙিন মঞ্চে আজ এক উত্তেজনাপূর্ণ সন্ধ্যা। আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপে আলোচিত আসরে পাকিস্তান ও ভারত আজ রাত সাড়ে ৭টায় মুখোমুখি হচ্ছে আর. প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে। কিন্তু এই ম্যাচের পেছনের গল্পে রয়েছে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান, আত্মমর্যাদা আর নীতির প্রশ্ন। মাঠের লড়াইয়ে দুই দল থাকলেও নেপথ্যের নায়ক বাংলাদেশ। নিজেদের মর্যাদা অটুট রেখে, নীতির প্রশ্নে আপস না করে পাকিস্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সহায়তায় বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, ক্রিকেট কেবল ব্যাট-বলের খেলা নয়; এটি সম্মান, সাহস আর আত্মপরিচয়েরও লড়াই।
নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার দাবিতে যখন বাংলাদেশ আপসহীন অবস্থান নেয়, তখন অনেকেই ভেবেছিল বিশ্বকাপের সূচি বদলে যাবে। আইসিসির মোড়কে ভারতের অনীহা, স্কটল্যান্ডকে সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল অস্থিরতা। ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায় পাকিস্তান। বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে তারা জানিয়ে দেয়, অসহযোগিতার প্রতিবাদে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দেয়। অবশেষে আর্থিক ক্ষতি ও বৈশ্বিক সমালোচনার শঙ্কায় বাংলাদেশের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয় আয়োজক পক্ষ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আজ হচ্ছে পূর্বনির্ধারিত ভারত-পাকিস্তান।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ মানেই পরিসংখ্যানের একপেশে গল্প। পরিসংখ্যানের দিক থেকে টি-২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৬ দেখায় ১৩ জয় নিয়ে এগিয়ে ভারত, পাকিস্তানের জয় তিনটি। টি-২০ বিশ্বকাপে আটবারের লড়াইয়ে ভারত ৬-১ ব্যবধানে এগিয়ে, একটি ম্যাচ হয়েছে পরিত্যক্ত। চলতি বিশ্বকাপে পাকিস্তান জিতেছে নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে। অন্য দিকে সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বাধীন ভারত হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও নামিবিয়াকে। প্রস্তুতি, কন্ডিশন ও দলগত ছন্দ- এই তিন জায়গায় এগিয়ে থেকেই মাঠে নামবে সালমান আলি আগার পাকিস্তান। বিশ্বকাপ শুরুর অনেক আগেই কলম্বোয় পৌঁছে অনুশীলন করে দলটি। একই হোটেলে থাকা, একই পরিবেশে প্রস্তুতি- সব মিলিয়ে স্থানীয় পরিস্থিতির সাথে দ্রুত মানিয়ে নিয়েছে সালমানের দল।
অন্য দিকে ভারতকে প্রথমে দেশের মাটিতে দু’টি ম্যাচ খেলে পরে শ্রীলঙ্কায় গিয়েছে। শ্রীলঙ্কার উইকেটের চরিত্র খুব একটা বদলায় না ঠিকই; কিন্তু আগে থেকে খেলে ফেলার অভিজ্ঞতা পাকিস্তানকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে। আজকের ম্যাচে স্পিনই হতে পারে পাকিস্তানের প্রধান অস্ত্র। আবরার আহমেদ, মোহাম্মদ নওয়াজ ও শাদাব খানের সাথে তুরুপের তাস হিসেবে থাকছেন উসমান তারিক। তার অদ্ভুত বোলিং অ্যাকশন ও বৈচিত্র্য ভারতীয় ব্যাটারদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হতে পারে। আগের ম্যাচে তিন উইকেট নিয়ে নজর কাড়েছেন। পাশাপাশি ওপেনার সাইম আয়ুবও পাওয়ার প্লেতে নিয়মিত বল করেন। সব মিলিয়ে পাঁচজন স্পিন বিকল্প নিয়ে ভারতের বিপক্ষে নামার পরিকল্পনা পাকিস্তানের।
ভারত যে স্পিনের বিরুদ্ধে অস্বস্তিতে পড়তে পারে, তার আভাস মিলেছে নামিবিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেই। একের পর এক উইকেট পড়ে এবং রান তোলার গতি কমে যায়। ফলে পাকিস্তানের স্পিন আক্রমণের সামনে সূর্যকুমার যাদবদের কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হতে পারে। এর সাথে যোগ হয়েছে চোট-দুশ্চিন্তা। অভিষেক শর্মার খেলা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। গত এক বছর ধরে দলের নিয়মিত ওপেনার হিসেবে ধারাবাহিক সাফল্য এনে দেয়া এই ব্যাটারকে না পেলে ভারতের ব্যাটিং ভারসাম্যে প্রভাব পড়তে পারে।
আত্মবিশ্বাসের দিক থেকেও এগিয়ে পাকিস্তান। বিশ্বকাপের আগে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ছন্দে ছিল। টুর্নামেন্টেও প্রথম দু’টি ম্যাচ জিতে নকআউটের পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে দলটি। বাবর আজম রানে ফিরেছেন, বোলিং আক্রমণ ছন্দে- সব মিলিয়ে পাকিস্তান মরিয়া হয়ে নামবে ভারতের বিপক্ষে।
হাত কি মেলাবে ভারত
স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসছে ‘নো হ্যান্ডশেক’ বিতর্ক। গত সেপ্টেম্বরে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে পাকিস্তানের কারো সাথে হাত মেলাননি ভারতীয় ক্রিকেটাররা। এবার টি-২০ বিশ্বকাপেও কি একই চিত্র দেখা যাবে? এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
পরিবেশ বরাবরের মতো উত্তপ্ত হলেও পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আলী আগা ভূ-রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মাঠের লড়াইয়ের দিকেই মনোযোগ রাখতে চান। সংবাদ সম্মেলনে তিনি শুধু কৌশল নিয়ে কথা বলেননি; বরং ক্রিকেটের সেই সময়ের জন্য আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন, যখন গ্যালারির গর্জন ছিল শুধু মাঠের পারফরম্যান্সের জন্য। তবু বিতর্কের প্রশ্ন কি আর এড়াতে পারেন। এবার ভারতীয় খেলোয়াড়েরা হাত মেলাবে কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে গতকাল সংবাদ সম্মেলেনে সালমান বলেন, ‘খেলাটি প্রকৃত চেতনা বজায় রেখে খেলা উচিত। বছরের পর বছর ধরে ক্রিকেটে এটাই স্বাভাবিক হয়ে আসছে। কিন্তু তারা কী চায়, সেটা কালই (আজ) জানতে পারব।’
সূর্যকুমার যাদব
ভারতীয় এ অধিনায়ক বেশি কথার দিকে গেলেন না। শুধু বললেন, ‘কারা এগিয়ে তা পরিসংখ্যানই বলে দেবে। আমরা মাঠে আরো একবার প্রমাণ করতে চাই। ওপেনার অভিষেককে নিয়ে একটু দুশ্চিন্তা থাকলেও ভারত সবসময় টিমের উপরই নির্ভর করে, ব্যক্তিগত ভরসায় নয়।’
প্রেমাদাস স্টেডিয়ামের পিচ রিপোর্ট
আর প্রেমাদাস স্টেডিয়ামের পিচ কালো মাটির উইকেট দিয়ে তৈরি। শুরুতে, পিচটি কিছু ভালো বাউন্স দেখায়, তাই ওপেনারদের জন্য আঘাত করা এবং এগিয়ে যাওয়া সহজ। তবে, খেলা যত এগোয়, উইকেট রুক্ষ হয় এবং গ্রিপ করে। পিচের এই পরিবর্তন স্পিনারদের জন্য স্বপ্নের মতো হয়ে ওঠে। পেসাররা সুইং থেকে সামান্য সাহায্য পায়, তাই কাটার এবং পেস বোলিংয়ে আধিপত্য থাকে।
সাহেবজাদা ফারহান বনাম জসপ্রীত বুমরাহ
জসপ্রীত বুমরাহকে পরাজিত করা প্রথম পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান হয়ে ফারহান সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন, কারণ তিনি বোলারের বিরুদ্ধে অপরাজিত ৫১ রান করেছেন। তিনি কিছুটা আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে ভারতের স্পিড ডায়নামোকে মোকাবেলা করেছেন। ফারহান বিশেষ করে বুমরাহের অ্যাঙ্গেল ডেলিভারিগুলোকে ভালো করেই সামলান বাউন্ডারি হাঁকিয়ে।
হার্দিক পান্ডিয়া বনাম উসমান তারিক
হার্দিক এবং তারিকের মধ্যে লড়াইটি সম্পূর্ণ মানসিক। তারিকের অনন্য অ্যাকশন ব্যাটসম্যানকে ধোঁকা দেয়ার সুবিধা দেয়। তবে ভারতীয় সহ-অধিনায়কের মনোযোগ থাকবে একটি বড় পরীক্ষার ওপর। যদি সে এটি সহজে করে, তবে সে পাকিস্তানের মূল স্পিনারকে তুলোধুনো করতে পারে।
অভিষেক শর্মা বনাম শাহিন শাহ আফ্রিদি
আধিপত্য বিস্তারের কৌশল দু’জন নেই। ভারতীয় ওপেনার তাদের শেষ সাক্ষাতের সময় বাম হাতের পেসারকে চমকে দিয়েছিলেন, প্রথম বলেই আকাশছোঁয়া ছক্কা মেরেছিলেন। যেহেতু শাহিন এখন এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে, যেখানে তাকে তার সেরাটা দিতে হবে, তাই সম্ভবত অভিষেকের ডান কাঁধের নড়াচড়া সীমিত করার জন্য সে কিছু ধারালো বাউন্সার ছুড়বে।
বাগড়া দিতে পারে বৃষ্টি
স্টেডিয়ামটি একটি নিম্নচাপ অঞ্চলের কারণে বড় হুমকির মুখে রয়েছে, যা বঙ্গোপসাগরের উপর ঝড় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এর ফলে ম্যাচের সময় বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি থাকে। আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, আজ কলম্বোয় ১০০ শতাংশ মেঘাচ্ছন্ন আকাশ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সন্ধ্যা ৬টার দিকে ম্যাচ শুরুর এক ঘণ্টা আগে বৃষ্টির সম্ভাবনা ৪৯ শতাংশ। যদিও সন্ধ্যা ৭টার সময় বৃষ্টির সম্ভাবনা কমে ৯ শতাংশে নেমে আসবে।
বাবর আজম
৩১ বছর বয়সী এই ব্যাটার জোর দিয়ে বলেন, এমন ম্যাচে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসিক দৃঢ়তা। বাইরের আলোচনা ও সমালোচনায় কান না দিয়ে শান্ত ও স্বাভাবিক থাকা জরুরি। ‘আমি অনেক ম্যাচ খেলেছি। আমরা শিখেছি, যত বেশি ঠাণ্ডা মাথায় ও নির্ভার থেকে খেলতে পারি এবং মানুষের কথায় কান না দিই, ততই ভালো ফল পাওয়া যায়। তরুণরা প্রায়ই উত্তেজিত হয়ে পড়ে; কিন্তু সহজ ও চাপমুক্ত থাকলে সেটাই পক্ষে কাজ করে।’
বেড়ে গেছে হোটেল ভাড়া
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভারত-পাকিস্তান হাইভোল্টেজ ম্যাচ ঘিরে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ক্রিকেট ভক্তদের ঢল নেমেছে। হাজার হাজার দর্শকের আগমনে শহরটির হোটেল ভাড়া ও বিমান টিকিটের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। চাপ সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। কলম্বোর বড় স্টেডিয়ামের প্রায় ৩৫ হাজার টিকিটের সব ক’টি বিক্রি হয়ে গেছে।
বুকিং সাইটগুলো বলছে, চাহিদার কারণে হোটেলের কক্ষ ভাড়া ১০০-১৫০ ডলার থেকে বেড়ে এখন ৬৬০ ডলারে পৌঁছেছে। কলম্বোর ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলো জানিয়েছে, চেন্নাই ও দিল্লির মতো শহর থেকে আসা ফ্লাইটগুলো এখন পুরোপুরি ভর্তি। চেন্নাই থেকে কলম্বোর বিমান ভাড়া তিন গুণ বেড়ে প্রায় ৭৫৬ ডলার এবং দিল্লি থেকে ভাড়া ৫০ শতাংশ বেড়ে ৬৬৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। টিকিট, হোটেল ও বিমান ভাড়া মিলিয়ে এই প্যাকেজের খরচ এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ডলার ছাড়িয়েছে।



