১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক

সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারের অদক্ষতা জাতির কাছে স্পষ্ট

Printed Edition
বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে লংমার্চ সামনে রেখে ১১ দলীয় ঐক্য সংবাদ সম্মেলন করে : নয়া দিগন্ত
বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে লংমার্চ সামনে রেখে ১১ দলীয় ঐক্য সংবাদ সম্মেলন করে : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, সরকার বিভিন্ন সঙ্কট মোকাবেলায় যেভাবে অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে, তা জাতির কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ছয় মাস সরকারের জন্য বেশি সময় নয়, কিন্তু বিকল্প পরিকল্পনা ও সঙ্কট মোকাবেলার সক্ষমতা নিয়ে অপেক্ষা করার সুযোগও বেশি নেই।

গতকাল ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে হামিদ আযাদ বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর ইতোমধ্যে ছয় মাস পার হয়েছে। এ সময়ে জনগণের দাবি, জনস্বার্থ, জনগণের অধিকার, দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে ১১ দলীয় ঐক্য ভূমিকা পালন করে আসছে।

তিনি বলেন, মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম ছিল গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। জুলাই আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি ও চেতনা এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার ও বিচারের যে দাবি উঠেছিল, সংসদে ১১ দলের প্রতিনিধিরা শুরু থেকেই সে বিষয়ে ভূমিকা রেখে আসছেন। সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে জনগণের মতামত জানতে গণভোট হয়েছে এবং সেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে। জনগণের এ রায় সরকারকে বাস্তবায়ন করতে হবে।

হামিদুর রহমান বলেন, সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ লাইন ও তেল সঙ্কট। এ সঙ্কটের কারণে রাস্তায় গাড়ি চলাচল ব্যাহত হয়েছে, কৃষকরাও সমস্যায় পড়েছেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিষয়টি সংসদে আলোচনার জন্য তোলা হয়েছিল। সরকারকে আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট মোকাবেলার আহ্বান জানানো হলেও কোনো কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি।

তিনি বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দলকে নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে সঙ্কট মোকাবেলার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ১০টি প্রস্তাবও দেয়া হয়। কিন্তু সরকার সেগুলোর কোনোটি আমলে নেয়নি। বরং তেল সঙ্কটের অজুহাতে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। অথচ নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মধ্যে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি না করার। এখানেও সরকার তাদের কমিটমেন্ট রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

গ্যাস সঙ্কটের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রায় ১২০০ বেকারি বন্ধ হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর এসেছে। বিজিএমইএ সভাপতির সাথেও তারা দেখা করেছেন। গ্যাস সঙ্কটের কারণে শিল্পকারখানা চালানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও এর প্রভাবের মধ্যে পড়ছে। অর্ডার বাতিল হয়ে গেলে তা পাশের দেশে চলে যেতে পারে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় দ্রব্যমূল্য নিয়ে অনেক সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার আসার পর দ্রব্যমূল্য হু হু করে বেড়ে গেছে। বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, বাজার মনিটরিং এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।

দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধ হয়নি উল্লেখ করে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকার দুর্নীতি দমন, চাঁদাবাজি বন্ধ ও দখলদারিত্ব বন্ধের কথা বলেছিল, কিন্তু বাস্তবে এগুলোর কোনোটিই বন্ধ হয়নি। এক কথায় দেশের জনজীবন দুর্বিষহ এবং সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

এ অবস্থায় ১১ দলীয় ঐক্য রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখবে জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় তারা রাজপথে কর্মসূচি দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে প্রথম লংমার্চ শেষ হয়েছে। সেখানে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি মানুষের সাড়া পাওয়া গেছে।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৭টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সবাই জমায়েত হবে। সকাল ৮টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার উদ্বোধনী সভা শেষে লংমার্চ শুরু হবে। পথে পাঁচটি পথসভা অনুষ্ঠিত হবে এবং রংপুর জেলা স্কুল মাঠে গিয়ে সমাপনী জনসভা হবে।

তিনি বলেন, ছয় দফা দাবি এখন সাত দফায় রূপান্তরিত হয়েছে। দেশে দুর্নীতি প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে চলছে এবং দুর্নীতি, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজি বিগত ফ্যাসিস্ট আমলকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। এ কারণে নতুন করে এ দাবি যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দলীয়করণ বন্ধ এবং বিচার দৃশ্যমান করার দাবিও রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাগপার প্রধান মুখপাত্র ও সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, নেজামে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল মিয়াজী, এবি পার্টির অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন, বিডিপির মহাসচিব নাঈম নিজামুদ্দিন নাঈম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এসএম ইউসুফ আলীসহ বিভিন্ন দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

পীরগঞ্জে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যুতে মিয়া গোলাম পরওয়ারের শোক ও প্রতিবাদ : জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে আহত বাংলাদেশী যুবক আসাদুল হক (৩৮) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। আরো দুই বাংলাদেশী নাাগরিক গুরুতরভাবে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন। আমি এ হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি এবং এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। একই সাথে নিহতের পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি এবং আহতদের আশু আরোগ্য কামনা করছি।

তিনি আরো বলেন, সীমান্তে অন্য দেশের নাগরিককে কোনো কারণেই গুলি করে হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের নাগরিককে গুলি করে হত্যা করা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থী।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, সমতা, ন্যায়বিচার ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। সীমান্তে বারবার প্রাণহানির ঘটনা কোনোভাবেই দুই দেশের জনগণের প্রত্যাশিত সুসম্পর্কের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করে মানবিক ও শান্তিপূর্ণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ ঘটনার বিষয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক ও জোরালো প্রতিবাদ জানাতে হবে এবং পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে হবে। একই সাথে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণহানি রোধে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।