আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে আজ বুধবার থেকে শুরু হয়েছে দুই দিনের সাধারণ ছুটি। উৎসবমুখর এই নির্বাচনে ভোট দেয়ার লক্ষ্য গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়তে (ঘরমুখী) শুরু করেছেন।
অবশ্য অনেকেই দূরপাল্লার বাস, ছোট বড় যানবাহন না পেয়ে, আবার অনেকে যানবাহন পেলেও নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই পথে পথে ভোগান্তি সহ্য করে গন্তব্যর উদ্দেশ রওনা হয়েছেন। নির্বাচনের পর দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটি। সরকারি দু’দিন আর সাপ্তাহিক দুই দিন সব মিলিয়ে টানা চার দিনের ছুটিতে অনেকেই বাড়িতে ফিরছেন। তবে বাড়ি ফিরতে গিয়ে সড়ক-মহাসড়কে তারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আর এসব অনিয়ম যেসব কর্মকর্তাদের দেখে ব্যবস্থা নেয়ার কথা, তাদের কারো দেখা পাননি রাস্তায় অগণিত ভোগান্তির শিকার হওয়া নারী শিশুসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। অনেকে আবার বিভিন্ন জেলা থেকেও ভোট দেয়ার জন্য ঢাকার উদ্দেশ রওনা হন।
এ দিকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনা মোতাবেক সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে গত ১ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তাতে সারা দেশে কখন, কোনদিন কোন গাড়ি চলাচল করতে পারবে, কোনটা পারবে না তা উল্লেখ করা হয়। নির্বাচনের দিন ট্যাক্সি ক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নয়া দিগন্তকে জানান, নির্বাচনের দিন দূরপাল্লার বাস স্বাভাবিকভাবে চলাচল করবে। আর ছোট ছোট গাড়ি চলাচলের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত দেয়া হবে।
গতকাল দুপুরে পুরান ঢাকার চানখাঁরপুল মোড় হয়ে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার দিয়ে দেশের বিভিন্ন গন্তব্য চলাচলকারী প্রতিটি গাড়িতেই তিল ধরনের জায়গা ছিল না। অনেকক্ষণ পরপর একটি গাড়ি এলে সেটিতে যাত্রীদের হুমড়ি খেয়ে পড়তে দেখা যায়। অনেকে গাড়িতে উঠতে না পেরে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকেন। গাড়ির সঙ্কটের কারণে উপায় না পেয়ে কর্মজীবী মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে মিনি খোলা ট্রাকে উঠে গন্তব্যর উদ্দেশ রওনা হতে দেখা যায়। এর পরও বাসগুলোর কন্ডাক্টরা তাদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
একই চিত্র দেখা যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকাতে। সকাল থেকেই এই অস্থায়ী বাস টার্মিনালে শত শত মানুষকে গন্তব্য যাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা যায়। অনেকক্ষণ পর বাস এলে হুড়মুড় করে যাত্রীরা বাসে উঠেন এবং তাদের ব্যাগ তুলেন। আবদুল্লাহপুরে বাসস্ট্যান্ডে দূরপাল্লার যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ শুনে সেনাবাহিনীর সদস্যরা অভিযানে নামেন।
শুধু সাইনবোর্ড, আবদুল্লাহপুর, কল্যাণপুর নয়, ঢাকা থেকে বের হওয়ার পর মোড়ে মোড়ে গাড়িগুলো যানজটে পড়ে। এতে যাত্রীদের গাড়িতে বসেই নাকাল হতে হয়, সৃষ্টি হয় যানজট। এরমধ্যে যাত্রবাড়ী মোড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
কল্যাণপুরে ঘরমুখো মানুষ বাসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। এ সময় দেখা যায়, মানুষ যত বেশি বাসের সংখ্যা ততই কম। ফলে এক পর্যায়ে মানুষের ভিড় এখানে অনেক বেড়ে যায়। একই চিত্র দেখা যায় গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চার দিনের ছুটিতে বাড়ি ফেরা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভিড় লেগেছে রাজবাড়ির দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায়ও।
শুধু বাসস্ট্যান্ট আর টার্মিনালে নয় নির্বাচনী উৎসবে যোগ দিতে বাসের মতো ট্রেনেও ছিল অতিরিক্ত ভিড়। আবার যারা বাস, ট্রেনের টিকিট কাটতে পারেননি, তারা আবার বিকল্প হিসেবে ট্রাকে, পিকআপে উঠে গন্তব্য ছুটেছেন।
মুন্সীগঞ্জের ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে যাত্রীরা ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এক্সপ্রেসওয়ের নিমতলা, হাসাড়া, ষোলঘর ও শ্রীনগর এলাকায় বাস থামিয়ে যাত্রী না নেয়া এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেন সাধারণ যাত্রীরা।
মঙ্গলবার সকাল থেকে এসব পয়েন্টে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক যাত্রী পরিবহন পাননি। তাদের দাবি, বাসগুলো ফাঁকা আসন থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় স্টপেজ থেকে যাত্রী তুলছে না। কেউ কেউ জানান, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি অর্থ দাবি করা হচ্ছে।
একই অবস্থা ছিল পুরান ঢাকার সদরঘাটের লঞ্চ টার্মিনালেও। নির্বাচনে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে এখানেও। তবে রাত ৮টায় এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সড়ক মহাসড়কে কোনো বড় ধরনের দুঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারির পূর্ববর্তী মধ্যরাত অর্থাৎ ১১ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সি ক্যাব, পিকআপ মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সেই সাথে ১০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত মধ্যরাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো বলে মন্ত্রণালয়ের ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়। দূরপাল্লার বাস চলাচলের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলা না হলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মো: আবদুল মাবুদ গত সোমবার রাতে নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, নির্বাচনের দিন দূরপাল্লার বাস চলাচল করবে। ভোটিং সেন্টারের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দেয়া নির্দেশনা মোতাবেক ছোট ছোট গাড়ি চলাচল করবে।



