পুলিশের ৩৩ শীর্ষ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর

Printed Edition
পুলিশের ৩৩ শীর্ষ কর্মকর্তাকে  বাধ্যতামূলক অবসর
পুলিশের ৩৩ শীর্ষ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের পুলিশ প্রশাসনে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ৩৩ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। গতকাল রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।

অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি এবং পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন, আবার অনেকে দীর্ঘদিন ধরে ওএসডি বা সংযুক্ত অবস্থায় দায়িত্ব পালন করছিলেন।

যারা অবসরে গেলেন

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম, ডিআইজি মো: সাইফুল ইসলাম, ডিআইজি মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ, ডিআইজি শাহ মিজান শাফিউর রহমান, ডিআইজি এস এম মোস্তাক আহমেদ খান, ডিআইজি জিহাদুল কবির, ডিআইজি মঈনুল হক, ডিআইজি মো: ইলিয়াছ শরীফ, ডিআইজি শ্যামল কুমার নাথ, ডিআইজি মো: জাকির হোসেন খান, ডিআইজি মো: শাহ আবিদ হোসেন, ডিআইজি মো: জামিল হাসান, ডিআইজি মো: মাহবুবুর রহমান এবং ডিআইজি মো: মনিরুজ্জামান।

এ ছাড়া অতিরিক্ত ডিআইজি ও সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. বরকতুল্লাহ খান, টি এম মোজাহিদুল ইসলাম, মো: আনোয়ার হোসেন খান, মোহা: মনিরুজ্জামান, মো: মেহেদুল করিম, মো: আলমগীর কবীর, মো: রশীদুল হাসান, সঞ্জয় কুমার কুন্ডু, মো: নিজামুল হক মোল্যা, এস এম এমরান হোসেন, মুহাম্মদ সাইদুর রহমান খান, ড. শামসুন্নাহার, মোল্লা জাহাঙ্গীর হোসেন, সাইফুল্লাহ আল মামুন, খান মুহাম্মদ রেজোয়ান, মো: সাজিদ হোসেন, শেখ রফিকুল ইসলাম এবং মো: মাশরুকুর রহমান খালেদ। পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আরেফও এ তালিকায় রয়েছেন।

গত এক বছরের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, পুলিশ প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে তারই অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল, ওএসডি করা, প্রশাসনিক তদন্ত এবং বাধ্যতামূলক অবসরের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

বিশেষ করে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এর আগে পুলিশের একাধিক সাবেক আইজিপি, অতিরিক্ত আইজিপি এবং মহানগর পুলিশ কমিশনারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী, জনস্বার্থে সরকার কোনো সরকারি কর্মচারীকে চাকরির নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই অবসরে পাঠাতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিধি অনুযায়ী অবসরজনিত সব আর্থিক সুবিধা ও পেনশন পাওয়ার অধিকারী হন।

প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারাটি সরকারের একটি প্রশাসনিক হাতিয়ার হলেও এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনের জন্য প্রশাসনিক জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।

পুলিশ প্রশাসনে কী বার্তা দিলো এ সিদ্ধান্ত?

বিশ্লেষকদের মতে, একসাথে ৩৩ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত পুলিশ প্রশাসনের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। এটি শুধু প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয় বরং গত দেড় দশকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত প্রশাসনিক কাঠামোর পুনর্মূল্যায়নের অংশ বলেও মনে করা হচ্ছে।

তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এখন দু’টি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে- একদিকে অতীতের অভিযোগ ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন মোকাবেলা করা, অন্য দিকে একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জনমুখী পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন করা। রোববারের এই সিদ্ধান্ত সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।