অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সপ্তাহের চার কর্মদিবসেই দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধনের ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ তথা সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা হারিয়ে গেল। ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা পুঁজিবাজারটির মূলধন গত বৃহস্পতিবার দিনশেষে নেমে আসে ৬ লাখ ৭৫ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকায়। এতে ১০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা মূলধন হারায় পুঁজিবাজারটি। দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সপ্তাহের চার কর্মদিবসেই বাজার মূলধনের এ অবনতি ঘটে।
গত সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৩২ দশমিক ৪২ পয়েন্ট হারায়। রোববার ৪ হাজার ৯৬৩ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার দিনশেষে নেমে আসে ৪ হাজার ৮৩১ দশমিক ৪১ পয়েন্টে। এ সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৪৩ দশমিক ৪৩ ও ৩৩ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা সপ্তাহের পুরোটা সময় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ১২ ডিসেম্বর ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক হত্যাচেষ্টা থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতিকেই দায়ী করেছেন। তারা মনে করেন খুবই সংবেদনশীল হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যেকোনো নেতিবাচক ঘটনা খুব দ্রুতই প্রভাবিত করে পুঁজিবাজারকে। আর গত সপ্তাহের পুরোটা সময়জুড়ে বাজার পতনের এটাকেই কারণ মনে করছেন তারা। এ ধরনের যেকোনো পরিস্থিতিতেই বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পান। বিপরীতে নিজেদের মূলধন রক্ষা করতে গিয়ে বাড়িয়ে দেন বিক্রয়চাপ।
সূচকের এ অবনতি ডিএসইর লেনদেনকেও প্রভাবিত করে গত সপ্তাহে। এ সময় বাজারটির লেনদেন হ্রাস পায় ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। গত সপ্তাহে ডিএসইতে মোট লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে ১ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ৫৩৯ কোটি টাকা কম। তবে এ সপ্তাহে মোট কর্মদিবস ছিল চারটি। একই সময় বাজারটির গড় লেনদেন ৪১৭ কোটি টাকা থেকে নেমে আসে ৩৮৭ কোটি টাকায়। চলমান বাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে আরো সময় লাগবে এমনটিই মনে করেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।
এ দিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবগঠিত পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল (এসএসি) তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক সভা সম্পন্ন করেছে।
বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি ভবনের সভা কক্ষে এই বৈঠকটি আয়োজিত হয়। এই সভায় কাউন্সিলের সদস্যরা শেয়ারবাজার-এর ইসলামী বিনিয়োগ ও শরিয়াহ পরিপালন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। বিএসইসির পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভার প্রথমাংশে কাউন্সিলের সদস্যরা কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। গত ২২ অক্টোবর ২০২৫-এ জারিকৃত অফিস আদেশ অনুযায়ী এই কাউন্সিলটি গঠিত হয়েছিল। বর্তমান কমিশনের সাথে নতুন কাউন্সিলের এই সাক্ষাৎটি ছিল পারস্পরিক পরিচিতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার একটি অংশ।
সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে বেলা ৩টায় শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের নিয়মিত কার্যবিবরণী শুরু হয়। এটি ছিল কাউন্সিলের নবগঠিত কমিটির প্রথম সভা। সভায় সভাপতিত্ব করেন শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভিসি অধ্যাপক ড. নাকিব মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ। সভায় সশরীরে উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করেন জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুমের সিনিয়র মুফতি মাসুম বিল্লাহ এবং জামিয়াহ শরিয়াহ মালিবাগের ডেপুটি মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. মুহা: রুহুল আমিন, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর সাদাত, বিআইএসির প্রধান নির্বাহী কে এ এম মাজেদুর রহমান এবং ইসলামী ব্যাংকের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ আব্দুর রহিম। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ সদস্য ভার্চুয়ালি এই সভার কার্যক্রমে অংশ নেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনজুর-ই-এলাহী। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট ইসলামিক ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ কবির হাসানও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সভায় যুক্ত হয়ে তার মূল্যবান পরামর্শ প্রদান করেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বিদায়ী সপ্তাহে লেনদেনের শীর্ষে উঠে এসেছে খাদ্য খাতের ফাইন ফুডস লিমিটেড। এ সময় প্রতিদিন গড়ে ১৫ কোটি ২৭ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির, যা ছিল ডিএসইর মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ। প্রতি দিন গড়ে ১৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা লেনদেন করে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল প্রকৌশল খাতের ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস। সপ্তাহিক লেনদেনে কোম্পানিটির অবদান ছিল ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ওরিয়ন ইনফিউশন, লাভেলো আইসক্রিম, মুন্নু ফেব্রিক্স, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, সায়হাম কটন মিলস, খানব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, রহিমা ফুড করপোরেশন ও একমি পেস্টিসাইডস।
এ সময় ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ কোম্পানি ছিল খাদ্য খাতের বঙাগজ লিমিটেড। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ১৪ দশমিক ৭১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় ছিল রিলায়েন্স ওয়ান ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ সিকিউরিটিজের অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সিএপিএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, বিডি ওয়েল্ডিং, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ওয়াটা কেমিক্যালস, ভিএফএস থ্রেড লি. ও সায়হাম কটন মিলস।
একই সময় ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষ দশ কোম্পানির প্রথমেই ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি শ্যামপুর সুগার মিলস। কোম্পানিটির দরপতনে হার ছিল ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ১৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ দর হারিয়ে একই খাতের ঝিল বাংলা সুগার মিলস ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এএফসি এগ্রো বায়োটেক, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, এফএএস ফিন্যান্স, আরএসআরএম স্টিলস, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স, নর্দার্ন জুট, খুলনা পেপার অ্যান্ড প্রিন্টিং ও সিভিও পেট্রো কেমিক্যাল রিফাইনারি।



