জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতে নতুন অক্ষ গঠনের তৎপরতা

দোহায় যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-বাংলাদেশ-কাতার কৌশলগত আলোচনা

বাংলাদেশে চব্বিশের পাল্টা আরেকটি পরিবর্তন ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে ভারত এখন নিজেদের নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বলতে শুরু করেছে। দিল্লির স্বার্থে রাজনৈতিক পরিবর্তনে আমেরিকার সহানুভূতি চাইছে তারা। তারা বলে যাচ্ছে- ঢাকায় চীন-পাকিস্তান ও উগ্রপন্থী প্রভাব বাড়ছে। এটিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বাউলদের মাঠে নামিয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির কূটনৈতিক মানচিত্রে কাতার আবারো পরিণত হয়েছে বহুপক্ষীয় আলোচনার কেন্দ্রস্থলে। বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অতি সম্প্র্রতি দোহায় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, কাতার এবং বাংলাদেশের একাধিক সিনিয়র কূটনীতিকের মধ্যে পরোক্ষ, আড়াল-আলোচনা ও ইনফর্মাল কনসালটেশন বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিষয়টি এখনো প্রকাশ্যে না এলেও এ বৈঠকগুলোকে ঘিরে আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নতুন প্রশ্ন উঠেছে- ঢাকা কি মধ্যপ্রাচ্য-ইন্দো-প্যাসিফিক শক্তি খেলায় একটি ‘কী-স্টেট’ হয়ে উঠছে?

পেছনে ৩টি ভূকৌশলগত কারণ : প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি দোহায় অবস্থিত। এ আল ওদেইদ এয়ারবেস থেকে ওয়াশিংটন কেবল গাল্ফ নয়, আফগানিস্তান-ইরাক-লেভান্ট অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করে। ফলে যেকোনো মধ্যস্থতা-সংশ্লিষ্ট আলোচনা কাতারকে কেন্দ্র করেই চলে।

দ্বিতীয়ত, এলএনজি বাজারের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ হয় কাতার থেকে। কাতারের নেতৃত্বে ২০২৫ পরবর্তী এলএনজি মূল্য কাঠামো পুনর্গঠন হতে যাচ্ছে। এতে বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা সরাসরি জড়িত।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন ‘বাংলাদেশ এখন এলএনজি চুক্তির প্রথম সারির আলোচনায় আছে। কাতার আমাদের জন্য নতুন জায়গা খুলে দিচ্ছে।’

তৃতীয়ত, কূটনৈতিক মধ্যস্থতার ঐতিহ্য রয়েছে কাতারের। তালিবান থেকে হামাস-ইসরাইল পর্যন্ত বিভিন্ন সঙ্কটে কাতারের ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য। ফলে বাংলাদেশকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আলোচনার জন্য কাতার একটি ‘নিউট্রাল হাব’।

এ চার-পক্ষীয় সমীকরণে আসল লক্ষ্য কী : ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক ব্লুপ্রিন্টে বাংলাদেশকে একটি ‘মিড-স্ট্র্যাটেজিক নোড’ হিসেবে ধরা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা দু’টি বিষয়ে বিশেষভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন- এক-বঙ্গোপসাগর-আন্দামান অঞ্চলে নৌ-নজরদারি দুই-বাংলাদেশের জ্বালানি ভঙ্গুরতা কমানো।

একজন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশকে স্থিতিশীল রাখতে পারলে ভারতের পূর্ব ফ্ল্যাঙ্ক এবং পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক সামুদ্রিক করিডোর নিরাপদ থাকে।’

গাল্ফ-বঙ্গোপসাগর করিডোরে দ্বিপক্ষীয় ভারসাম্য : ভারতের উদ্বেগ তিনটি : প্রথমত, কাতারে বাংলাদেশী শ্রমিকের সংখ্যাগত আধিপত্য, দ্বিতীয়ত, এলএনজি-গ্যাস করিডোরে চীন বা তুরস্কের প্রভাব আর তৃতীয়ত, বঙ্গোপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সমুদ্র সহযোগিতা বৃদ্ধি

ভারতের এক সাম্প্রতিক নীতিসংক্রান্ত লেখায় উল্লেখ আছে- ‘বাংলাদেশ-কাতার শ্রম অভিবাসন নীতিতে নীরব পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার শ্রম বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে।’

বাংলাদেশের নীরব কূটনীতি, কিন্তু স্পষ্ট লক্ষ্য : বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্র তৎপরতায় তিনটি স্তর স্পষ্ট : ১. জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা-নতুন এলএনজি চুক্তি এবং অনশোর টার্মিনাল নির্মাণে কাতার-জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আগ্রহ। ২. দক্ষ শ্রমিক প্রেরণ-দোহা চায় দক্ষ জনশক্তি; বাংলাদেশ চায় মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট ভেঙে সরাসরি নিয়োগ। ৩. সামুদ্রিক নিরাপত্তায় ত্রিমুখী সমন্বয়- মার্ন-ভারত- বাংলাদেশ সমন্বিত নৌ-তথ্য বিনিময়ের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

কী বিষয়ে আলোচনা চলছে : একটি সূত্র বলছে- কাতার আলোচনায় অনেক বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি বিষয়ে ১৫-২০ বছরের এলএনজি মূল্য ফর্মুলা; কাতারের সার্বভৌম তহবিলের বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও চট্টগ্রাম/ পায়রা বন্দরে এলএনজি অবকাঠামো নিরাপত্তা ও সমুদ্র নজরদারি বিষয়ের আলোচনায় রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে সামুদ্রিক ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস সম্প্রসারণ; ভারত-বাংলাদেশ কোস্টগার্ড যৌথ মহড়া ও কাতারের সাথে সাইবার নিরাপত্তা প্রটোকল।

শ্রমবাজারবিষয়ক আলোচনায় রয়েছে- উচ্চ দক্ষ টেকনিশিয়ান কোটা বাড়ানো, রিক্রুটিং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কাতার-বাংলাদেশ যৌথ টাস্কফোর্স ও গাল্ফে শ্রম অধিকার নজরদারি। বিনিয়োগসংক্রান্ত আলোচনায় রয়েছে- বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) এ কাতারের প্রবেশ এবং ব্লু–-ইকোনমি প্রজেক্টে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আগ্রহ।

দক্ষিণ এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্য অক্ষ পুনর্গঠনের ইঙ্গিত : পর্যবেক্ষকদের মতে, এ চার-পক্ষীয় সমীকরণ ইঙ্গিত দিচ্ছে একটি নতুন আঞ্চলিক কাঠামোর, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি শক্তি (কাতার) একটি পক্ষ থাকবে। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমশক্তি ও করিডোর হবে বাংলাদেশ। ভারতের প্রভাব বলয় থাকবে এ অঞ্চলে। যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নকশা থাকবে। এগুলো একত্রে মিলে একটি ‘হাইব্রিড জিও-ইকোনমিক অ্যালায়েন্স’ গঠন করা হতে পারে।

এক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন ‘ঢাকার সামনে এখন বিরল সুযোগ-মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক দুই অঞ্চলের ‘ব্যালেন্সিং স্টেট’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার।’

বাংলাদেশের জন্য কি এটি ‘গেম-চেঞ্জিং মুহূর্ত’ : কূটনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কাতারে চার-পক্ষীয় চলমান আলোচনার আসল লক্ষ্য- জ্বালানি নিরাপত্তা, শ্রমবাজার, বাণিজ্য করিডোর, সামুদ্রিক নিরাপত্তা- এগুলোকে একত্রে এনে এক নতুন ক্ষমতার অক্ষ গড়া।

বাংলাদেশ যদি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এগোতে পারে, তবে এটি হতে পারে ২০২৪-২৫ পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অর্জন।

সমস্যা দিল্লির রাজনৈতিক চাওয়া : তবে এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ইস্যু একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। বাংলাদেশে ২৪-এর পাল্টা আরেকটি পরিবর্তন ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে ভারত এখন নিজেদের নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বলতে শুরু করেছে। দিল্লির স্বার্থে রাজনৈতিক পরিবর্তনে আমেরিকার সহানুভূতি চাইছে তারা। তারা বলে যাচ্ছে- ঢাকায় চীন-পাকিস্তান ও উগ্রপন্থী প্রভাব বাড়ছে। এটিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বাউলদের মাঠে নামিয়েছে। আর নামে-বেনামে ভারতের রাজনৈতিক এসেট আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আনতে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। যতদূর জানা যায়- এখনো এ এজেন্ডায় আমেরিকান সহানুভূতি আদায়ে অগ্রগতি কিছু হয়নি।