লোকসানের ভারে ‘নুয়ে’ পড়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। বছরের পর বছর ধরে লোকসানই গুনছে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি। এবার এক বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা লোকসান করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই লোকসানকে ‘অস্বাভাবিক’ বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এই বিষয়ে ব্যাখ্যা তলব করার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, টিসিবি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকসান করেছিল এক হাজার ৪০৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। তার এক বছর পরই গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান বেড়ে হয়েছে সাত হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬ গুণ বা ৪৬০ শতাংশ।
এই ধরনের বিপুল পরিমাণ লোকসানকে ‘অস্বাভাবিক’ মনে করছে অর্থ বিভাগ। এই বিভাগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতি বছর বাজেট থেকে টিসিবিকে বিশাল অঙ্কের অর্থ ঋণ হিসেবে প্রদান করা হয়। কিন্তু এই ঋণ খুব কমই ফেরত পাওয়া যায়। টিসিবির পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে, তারা বিভিন্ন পণ্য বাজার দরে কিনে তা স্বল্পমূল্যে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করে থাকে। আর এতে তাদের প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ লোকসান দিতে হয়। কিন্তু তারা গত অর্থবছরে (২০২৪-২০২৫) যে সংশোধিত হিসাব আমাদের কাছে দিয়েছে তাতে দেখা গেছে আলোচ্য বছরে লোকসান গিয়ে ঠেকেছে প্রায় আট হাজার কোটি টাকায়। এই বিষয়টি আমাদের স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। তাই আমরা বিপুল পরিমাণ লোকসানের বিষয়ে তাদের কাছে জানতে চাইব।
এ দিকে অর্থ বিভাগ থেকে সদ্য প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৫’ অনুযায়ী, টিসিবি অনেক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে লোকসান দিয়ে চলেছে। যেমন- ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে টিসিবি লোকসান দিয়েছিল ১৮৬ কোটি টাকা। এর পরের অর্থবছরে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে লোকসান ছিল ৩০২ কোটি টাকা। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে লোকসান ৮৫৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে এক হাজার ১৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে লোকসান দেখানো হয়েছে এক হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তা প্রায় ছয় গুণ বেড়ে লোকসান হয়েছে সাত হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।
তবে টিসিবির যেসব সময় লোকসানই দিয়েছে তাই নয়, এর আগে কোনো কোনো বছর প্রতিষ্ঠানটি লাভের মুখও দেখেছে। যেমন- ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা দেখানো হয়েছে-৪০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। একইভাবে ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে মুনাফা হয় ৫৬ কোটি টাকা। ২০১৬-২০১৭ বছরে মুনাফা হয় ২৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। এর পরের অর্থবছরে দুই কোটি টাকা লোকসান দিলেও তারপরের অর্থবছরে (২০১৮-২০১৯) মুনাফা করে ৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
এ দিকে এর আগে টিসিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কেবল সয়াবিন তেল বিক্রিতেই প্রায় ৭৫৪ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়াও উচ্চ সুদহারে ব্যাংক ঋণ, পণ্য ক্রয়ে খরচ এবং পরিচালন ব্যয়ের কারণে টিসিবি বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিও হয়েছিল।
অপর দিকে, সংস্থাটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও কম নয়। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে করা বাংলাদেশ কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে (২০২২ সালের ৩৫ নম্বর কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্ট) উঠে এসেছে, এ সময়ের মধ্যে সংস্থাটিতে ২৯৭ কোটি ৬ লাখ টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।



