বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরী পোশাক খাত নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাচাহিদা হ্রাস, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে আগামী মৌসুমগুলোতে পোশাকের অর্ডার কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকরা। ইতোমধ্যে কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছে, যা দেশের রফতানি আয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরী পোশাক খাত থেকে। এই রফতানির বেশির ভাগই যায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। কিন্তু এসব বাজারে গত এক বছরে খুচরা বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় কমেছে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ভোক্তারা ব্যয়সঙ্কোচন নীতিতে যাচ্ছেন, ফলে বড় বড় ব্র্যান্ড নতুন পণ্যের অর্ডার দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে।
রফতানি প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি : ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট পোশাক রফতানি করেছে প্রায় ৪৭ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রফতানি ছিল প্রায় ২২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ শতাংশের বেশি।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি হয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশে। কয়েক বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের বার্ষিক রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধির নি¤œগতি মূলত চাহিদা সঙ্কোচনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গুদামে মজুদ, নতুন অর্ডারে ধীরগতি : ইউরোপের খুচরা বিক্রেতাদের গুদামে পোশাকের মজুদ বেড়ে যাওয়ায় তারা নতুন অর্ডার দেয়ার ক্ষেত্রে ‘ওয়াচ অ্যান্ড সি’ কৌশল নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোক্তারা পোশাকসহ অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে ক্রেতারা এখন ছোট লটে অর্ডার দিচ্ছেন, ডেলিভারি সময় বাড়াচ্ছেন এবং একই সাথে মূল্য কমানোর চাপ বাড়াচ্ছেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘চলতি মৌসুমে অনেক ব্র্যান্ড আগের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অর্ডার কমিয়েছে। বিশেষ করে বেসিক টি-শার্ট, সোয়েটার ও ডেনিম পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।’
তিনি জানান, কয়েকটি বড় কারখানা ইতোমধ্যে উৎপাদন লাইন কমিয়ে দিয়েছে এবং ওভারটাইম বন্ধ রেখেছে।
ইউরোপের ভেতরেও বাজারভেদে পার্থক্য : তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইউরোপের বাজারে জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালিতে রফতানি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ডে রফতানি কমেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে জার্মানিতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ১ শতাংশ বেশি।
স্পেনে রফতানি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশেরও কম। যুক্তরাজ্যে রফতানি ছিল প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার, যেখানে প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উদ্বেগ আরো গভীর : যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে আরো উদ্বেগজনক। ইউএস অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক আমদানি পরিমাণের দিক থেকে কমেছে প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনাম ও ভারতের রফতানি তুলনামূলক ভালো অবস্থানে ছিল। কারণ তারা ম্যানমেড ফাইবার (এমএমএফ) ভিত্তিক উচ্চমূল্যের পোশাকে জোর দিয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের উপস্থিতি এখনো সীমিত।
ব্যয় বাড়ছে, দাম বাড়ছে না : উদ্যোক্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যয় উল্টো বাড়ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কট, ডলারের উচ্চ বিনিময় হার, ব্যাংকঋণের সুদহার ১৩-১৪ শতাংশে পৌঁছানো এবং শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে অন্তত ১৮ থেকে ২০ শতাংশ। অথচ ক্রেতারা আগের দামেই পণ্য কিনতে চাইছেন।
একটি শীর্ষস্থানীয় পোশাক কারখানার মালিক বলেন, ‘গত বছর যে অর্ডারে পিসপ্রতি দাম ছিল ৪ দশমিক ২০ ডলার, এ বছর ক্রেতা অফার করছে ৩ দশমিক ৮০ ডলার। এই দামে উৎপাদন করাই কঠিন। অথচ প্রতিযোগী দেশগুলো নানাভাবে প্রণোদনা দিয়ে ক্রেতা ধরে রাখছে।’
পণ্যের বৈচিত্র্যে পিছিয়ে বাংলাদেশ : বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা পণ্যের ধরনে সীমাবদ্ধতা। বৈশ্বিক পোশাক বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ এখন ম্যানমেড ফাইবার বা সিনথেটিক ও ব্লেন্ডেড পণ্যের। কিন্তু বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানিতে এমএমএফ পণ্যের অংশ মাত্র ২৭ শতাংশ। ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা ক্রমেই এই ধরনের পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন, যেখানে ভিয়েতনাম, তুরস্ক ও চীন তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
পরিবেশ আইন ও নতুন চাপ : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পরিবেশ আইনও বাংলাদেশের পোশাক খাতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। কার্বন নিঃসরণ প্রতিবেদন, রিসাইকেলড উপাদান ব্যবহার এবং সাপ্লাই চেইনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। বড় শিল্পগ্রুপগুলো এসব মানদণ্ডে মানিয়ে নিতে পারলেও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো পিছিয়ে পড়ছে।
ভূরাজনীতি ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি : অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধু চাহিদা সঙ্কোচন নয়, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সমীকরণও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য নতুন বাণিজ্যনীতি, ইউরোপে মন্দার আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট বৈশ্বিক ক্রয়ক্ষমতাকে আরো কমাতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের রফতানি আয়ে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষক বলেন, ‘২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ অনেক বাজারে শুল্কসুবিধা হারাবে। তখন মূল্য প্রতিযোগিতা আরো কঠিন হবে। এখনই পণ্যে বৈচিত্র্য ও দক্ষতা বাড়ানো না গেলে ইউরোপ-আমেরিকার বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে।’
শ্রমিক ও সামাজিক উদ্বেগ : অর্ডার কমার আশঙ্কায় শ্রমিক সংগঠনগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, অর্ডার কমলে ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি বাড়ে। ইতোমধ্যে কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে নতুন নিয়োগ বন্ধ রাখা হয়েছে। শ্রমিক নেতাদের মতে, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারকে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে।
উদ্যোক্তাদের প্রস্তাব ও করণীয় : তৈরী পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা সুদের হার কমানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বন্দরে ডেলিভারি সময় কমানো এবং নতুন বাজারে প্রবেশে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ইউরোপ ও আমেরিকা আমাদের প্রধান বাজার থাকবে, কিন্তু একক নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের ব্র্যান্ডিং, ডিজাইন সক্ষমতা ও নিজস্ব ফ্যাশন লাইনে যেতে হবে। শুধু সস্তা উৎপাদন দিয়ে আর টিকে থাকা যাবে না।’
সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে খাত : আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি ইউরোপ ও আমেরিকার বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে সে পর্যন্ত টিকে থাকতে হলে খরচ কমানো, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং দক্ষতা বৃদ্ধিই হবে প্রধান কৌশল।
সব মিলিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজার পরিস্থিতি বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কসঙ্কেত দিচ্ছে। রফতানি পরিসংখ্যান বলছে, প্রবৃদ্ধির সোনালি সময় শেষ হয়ে আসছে। এখন প্রয়োজন কৌশলগত পরিবর্তন, বাজার বহুমুখীকরণ এবং সমন্বিত নীতিসহায়তা। তা না হলে অর্ডার কমার ঢেউ দেশের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে বড় ধাক্কা দিতে পারে- এ বিষয়ে খাতসংশ্লিষ্টরা প্রায় সবাই একমত।



