সুদব্যয় উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে

তিন বছরে সুদ দিতে হবে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা!

বাজেটে ক্রমবর্ধমান সুদব্যয় আর্থিক শৃংখলাকে নাজুক করে দিচ্ছে। প্রতি বছর সরকারকে তার ব্যয় মিটাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে। এই ঋণ একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ খাত থেকে নেয়া হচ্ছে। অন্য দিকে বিদেশী ঋণও সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই ঋণের সুদ মেটাতে প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই সুদ পরিশোধের পরিমাণ প্রতিবছরই বেড়েই চলেছে। আগামী তিন অর্থবছরে সুদ পরিশোধে সরকারকে ব্যয় করতে হবে চার লাখ ৩০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
Printed Edition

বাজেটে ক্রমবর্ধমান সুদব্যয় আর্থিক শৃংখলাকে নাজুক করে দিচ্ছে। প্রতি বছর সরকারকে তার ব্যয় মিটাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে। এই ঋণ একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ খাত থেকে নেয়া হচ্ছে। অন্য দিকে বিদেশী ঋণও সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই ঋণের সুদ মেটাতে প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই সুদ পরিশোধের পরিমাণ প্রতিবছরই বেড়েই চলেছে। আগামী তিন অর্থবছরে সুদ পরিশোধে সরকারকে ব্যয় করতে হবে চার লাখ ৩০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

অর্থ বিভাগের করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বাজেটে সুদখাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে এক লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৭-২০২৮ ও ২০২৮-২০২৯ অর্থবছরে সুদখাতে ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে যথাক্রমে এক লাখ ৪১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং এক লাখ ৬১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

প্রাক্কলন অনুযায়ী সুদব্যয় ধরে রাখা যাচ্ছে না

সুদব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে মূল বাজেটে ছিল এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সরকারের ঋণ অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণে সংশোধিত বাজেটে সুদখাতে ব্যয় বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। সরকারের ঋণ কমিয়ে আনতে না পারলে আগামী অর্থবছরেও প্রাক্কলনের চেয়ে সুদখাতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।

অর্থনীতির উদ্বেগের বিষয় সুদ ব্যয়!

অর্থ বিভাগের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের ঋণের ওপর সুদ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব আয়ের তুলনায় সুদ পরিশোধের খাতে ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকায় সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়াই এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ।

সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ও বিদেশী উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে ঋণ গ্রহণের পরিমাণও বেড়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সুদের হার বৃদ্ধির ফলে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ এখন শুধুমাত্র সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে।

বিদেশী ঋণের সুদব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন অর্থ বিভাগ

বিদেশী ঋণের সুদব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের কার্যকর ব্যবস্থাপনা শুধু আর্থিক শৃংখলা বজায় রাখার জন্যই নয়, বরং এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক ঋণমান বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতের উন্নয়ন সম্ভাবনা সুরক্ষিত রাখার জন্য অপরিহার্য। সম্প্রতি বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দকৃত বাজেটের পরিমাণে (টাকার অঙ্কে ও মোট সুদবাবদ ব্যয়ের শতাংশে) যে বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা এই বিষয়টির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।’

সুদের কারণে শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কৃষিখাতে বরাদ্দে চাপ!

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেছেন, সুদব্যয় বাড়ার ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। কারণ সরকারের মোট ব্যয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ সুদ পরিশোধে চলে গেলে উন্নয়নমূলক খাতে ব্যয় করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের গতিও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ ছাড়া ক্রমবর্ধমান সুদব্যয় সরকারের ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত দেয়। নতুন ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণের দায় পরিশোধের প্রবণতা দেখা দিলে তা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী থাকাও সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরো জটিল করে তুলছে। সুদব্যয় কমানোর একমাত্র সমাধান হচ্ছে রাজস্ব আয় বাড়ানো।