অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সূচক ও লেনদেনের বড় অবনতি দিয়েই সপ্তাহ শুরু করেছে দেশের পুঁজিবাজার। এর আগে গত সপ্তাহের প্রায় পুরোটা একপ্রকার গতিহীন কাটলেও সূচক ও লেনদেনের বড় অবনতি ঘটেনি। কিন্তু গতকাল সূচকের পাশাপাশি অবনতি ঘটেছে লেনদেনেরও। বাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণ নিয়ে কিছুটা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তারা মনে করেন, গত ক’দিনে বাজারে যথেষ্ট সংশোধন ঘটেছে। তাই সবার প্রত্যাশা ছিল নতুন সপ্তাহের শুরুতে আবার ঘুরে দাঁড়াবে বাজার। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা। তবে তারা আশাবাদী, খুব তাড়াতাড়ি বাজার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।
গতকাল লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজার। লেনদেনের বিভিন্ন পর্যায়ে এ চাপ সক্রিয় থাকায় ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বাজারগুলো। শেষ দিকে এসে এ চাপ তীব্র আকার ধারণ করলেও বড় পতনেই লেনদেন শেষ করে বাজারগুলো। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৮ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। পাঁচ হাজার ৮৬০ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি রোববার দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৮২২ দশমিক ৩১ পয়েন্টে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৫৫ ও ৬ দশমিক ৬ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্য সূচক সিএএসপিআই গতকাল ৯৭ দশমিক ৮১ পয়েন্ট হারায়। ১৫ হাজার ৭২৫ দশমিক ৮১ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি এদিন লেনদেনশেষে স্থির হয় ১৫ হাজার ৬২৭ দশমিক ১৮ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৯৩ দশমিক ৫৬ ও ৬৪ দশমিক ২০ পয়েন্টে।
সূচকের এ অবনতির গ্রভাব ছিল ঢাকা শেয়ারবাজারের লেনদেনে। এদিন ডিএসই ৯৬৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ১৮৩ কোটি টাকা কম। গত বৃহষ্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। তবে লেনদেন সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। এখানে ৩১ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় গতকাল। বুধবার বাজারটির লেণদেন ছিল ২৯ কোটি টাকা।
এ দিকে শেয়ারবাজারের মার্চেন্ট ব্যাংক জিএসপি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সার্বিক কার্যক্রম ও নিবন্ধনের যোগ্যতা যাচাই করতে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা, গ্রাহক হিসাব, মার্জিন ঋণ ও নিট সম্পদের পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখতে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সংস্থাটি। শেয়ারবাজার ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি পিএলসির সহযোগী প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কার্যক্রম যাচাই করবে বিএসইসির এই তদন্ত দল। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, তদন্ত শুরু হওয়ার পর ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে অনুসন্ধান শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে এ বিষয়ে একটি আদেশ জারি করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন কমিশনের উপপরিচালক মো: শাহনওয়াজ এবং সহকারী পরিচালক নুজহাত খাদিজা মিম।
বিএসইসির ওই সূত্র মতে, জিএসপি ইনভেস্টমেন্টের বিরূদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়ার পর কমিশন তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, আর্থিক হিসাব, গ্রাহক হিসাব, মার্জিন ঋণসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তে অনিয়ম, অসঙ্গতি বা বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মিললে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কমিশনের আদেশ অনুযায়ী, জিএসপি ইনভেস্টমেন্ট প্রতিষ্ঠার পর থেকে মার্চেন্ট ব্যাংক হিসেবে পরিচালিত সব কার্যক্রম আইন, বিধিমালা ও নিবন্ধন সনদের শর্ত মেনে হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করবে তদন্ত কমিটি। বিশেষভাবে ইস্যু ব্যবস্থাপনা, পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা, আন্ডাররাইটিং ও নিজস্ব বিনিয়োগসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হবে।
এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন সনদের শর্ত, ফরম ‘খ’ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার) বিধিমালা, ১৯৯৬-এর সংশ্লিষ্ট বিধান বিবেচনায় নেয়া হবে। পাশাপাশি গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি মার্চেন্ট ব্যাংক হিসেবে নিবন্ধনের অযোগ্য কোনো অবস্থায় পড়েছিল কি না, সেটিও যাচাই করা হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় নির্ধারিত নিবন্ধনের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্তগুলো পর্যালোচনা করবে তদন্ত দল।
এ ছাড়া তদন্তের আওতায় থাকবে জিএসপি ইনভেস্টমেন্টের গ্রাহকসংক্রান্ত নথিপত্রও। নির্ধারিত সময়ে গ্রাহকদের হিসাব, চুক্তিপত্র ও হিসাব বিবরণী যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রাহকদের তা সরবরাহ করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। একই সাথে গ্রাহকদের দেয়া মার্জিন ঋণ সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও নির্দেশনা অনুযায়ী দেয়া হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে
দেখা হবে।
প্রতিষ্ঠানটির গত পাঁচ বছরের আর্থিক অবস্থাও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। এ সময়ের নিরীক্ষিত ও অনিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, হিসাবের বই, সহায়ক নথি এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্য পরীক্ষা করবে তদন্ত কমিটি। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি ও আর্থিক বিবরণী সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা এবং ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন পর্যাপ্ততসংক্রান্ত বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা হবে।
এ ছাড়া মার্চেন্ট ব্যাংকারদের জন্য নির্ধারিত আচরণবিধি জিএসপি ইনভেস্টমেন্ট যথাযথভাবে অনুসরণ করেছে কি না, সেটিও যাচাই করবে বিএসইসি। তদন্তে কোনো লঙ্ঘন বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিধানের আলোকে প্রতিষ্ঠানটির মার্চেন্ট ব্যাংক হিসেবে নিবন্ধন সনদ বহাল রাখা বা নবায়নের বিষয়ে কমিশনের কাছে সুপারিশ করা হবে।
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ধারা ২১ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ধারা ১৭ (ক) অনুযায়ী প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এসব বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি। এ জন্য দুই কর্মকর্তার সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আদেশ জারির তারিখ থেকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।



