গাজার ‘নতুন স্বাভাবিকতা’র নির্মম চেহারা

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

Printed Edition
গাজার ‘নতুন স্বাভাবিকতা’র নির্মম চেহারা
গাজার ‘নতুন স্বাভাবিকতা’র নির্মম চেহারা

গাজায় এখন যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাতে অনাহার ও অসহায় শরীর নিয়ে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। ইসরাইলের দীর্ঘ গণহত্যামূলক আগ্রাসনের পর যুদ্ধবিরতি হলেও মানুষের দুর্ভোগ থামেনি। বরং শীত, বৃষ্টি ও আশ্রয়ের সঙ্কট গাজার মানুষের জন্য নতুন এক নরকে পরিণত হয়েছে।

গত মাসে প্রবল ঝড়ের মধ্য দিয়ে গাজায় শীত নামে। গভীর রাতে তাঁবুতে ঘুম ভেঙে দেখা যায় চার পাশ পানিতে ডুবে গেছে। তাঁবুর মেঝে পরিণত হয় ছোট জলাশয়ে। বিছানা, বালিশ, হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়-সব ভিজে যায়। কিছুই থাকে না শুকনা।

তাঁবুর বাইরে কান্নার শব্দ শোনা যায়। পাশের তাঁবুর তিনটি শিশু ঠাণ্ডায় নীল হয়ে গেছে। তাদের মা কাঁপতে কাঁপতে বলেন, বৃষ্টি সব ভেতরে ঢুকে পড়েছে। চার পাশে একই দৃশ্য। নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় বসে আছেন। বিছানা ভিজে গেছে। জিনিসপত্র ছড়িয়ে আছে। চার দিকে শুধু আর্তনাদ। সে দিন যথাযথ আশ্রয়হীন প্রায় ১৪ লাখ বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি একই কষ্ট ভোগ করেন। রোদ না থাকায় জিনিস শুকাতে দুই দিন লেগে যায়। অন্য কোথাও যাওয়ার উপায় ছিল না। তাই সেখানেই থাকতে হয়।

এক সপ্তাহ পর নেমে আরো ভয়াবহ ঝড়-বৃষ্টি। আঘাত হানে ‘স্টর্ম বাইরন’। আবারো ডুবে যায় তাঁবু। আবারো ঠাণ্ডায় কেঁপে ওঠে শিশুরা। যতই তাঁবু শক্ত করা হোক, কিছুই কাজে আসেনি। বাতাস ও বৃষ্টি সব কিছু ভেঙে দেয়। মাটি আর পানি শোষণ করতে পারে না। পুরো এলাকা জলাভূমিতে পরিণত হয়।

কর্তৃপক্ষ জানায়, অন্তত ২৭ হাজার তাঁবু ধ্বংস হয়েছে; অর্থাৎ ২৭ হাজার পরিবার আবার আশ্রয়হীন। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে পড়ে। এবারে ধসে ১১ জন মারা যায়। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা আর তৃতীয় শীত সহ্য করতে পারবে না। দুই শীত তাঁবুতে কাটানো হয়েছে। যুদ্ধবিরতি এলেও স্বস্তি আসেনি। অপুষ্টি ও রোগে দুর্বল শরীর নিয়ে মানুষ এখনো একই জায়গায় পড়ে আছে।

একটি চার বাই চার মিটারের তাঁবুতে সাতজনের বাস। দুই শিশু, একজন ৮০ বছরের বৃদ্ধা। বড়রা কিছুটা সহ্য করতে পারে। কিন্তু শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এটি অসহনীয়। মাটির ওপর গদি পাতা। নিচ ও ওপর থেকে ঠাণ্ডা ঢোকে। গরম করার কোনো ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ নেই। হিটার নেই। বৃদ্ধা ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারেন না। সারারাত কাঁপতে থাকেন। সব কম্বল তাঁর গায়ে চাপিয়ে দেয়া হয়। তবু দুশ্চিন্তা কাটে না।

অনেক পরিবার আরো ভয়াবহ অবস্থায় পড়েছে। একটি সাধারণ তাঁবুর দাম এক হাজার ডলার পর্যন্ত। তাঁবু বসানোর জায়গার ভাড়া ৫০০ ডলার। যারা দিতে পারে না, তারা রাস্তায় থাকে। সালাহ আল-দিন সড়কে শুধু কম্বল টাঙিয়েই দিন কাটাচ্ছে মানুষ। অনেক সময় সেগুলোও বাতাসে উড়ে যায়।

অনেক শিশু রাস্তায় ঘুমায়। কেউ মা হারিয়েছে, কেউ বাবা। কেউ চুপচাপ থাকে, কেউ কাঁদে, কেউ খাবার খোঁজে। সহায়তার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে কিছুই বদলায়নি। নভেম্বরে জাতিসঙ্ঘ মাত্র ৩০০টি তাঁবু দিতে পেরেছে। দুই লাখ ৩০ হাজার পরিবার পেয়েছে মাত্র একটি খাদ্য প্যাকেট। অনেক পরিবার কিছুই পায়নি। খাবারের দাম খুব বেশি। পুষ্টিকর খাবার নেই বা কেনার সামর্থ্য নেই। মাসের পর মাস প্রোটিন খাবার জোটেনি। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ হয়নি। স্থায়ী বাসস্থানের কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে ভয়ঙ্কর এক আশঙ্কা সামনে- তাঁবুই হয়তো দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা হয়ে যাবে।

বোমাবর্ষণের সময় মৃত্যুভয় ছিল। এখন যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু ‘নতুন স্বাভাবিকতা’ আরো নির্মম। এই শীতে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের মৃত্যুর আশঙ্কা আরো বেড়েছে। এরই মধ্যে ঠাণ্ডায় তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গাজায় গণহত্যা বন্ধ করতে চাইলে বিশ্বকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম শর্ত- খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।