বিশেষ সংবাদদাতা
২০২৬ সালেও চলছে সরকারি বিজ্ঞাপনের ২০১৩-এর বিজ্ঞাপন হার। এ ২৩ বছরে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে আড়াই শ’ শতাংশের কাছাকাছি। সরকারি বিজ্ঞাপনের হার যৌক্তিকরণ করার জন্য সংবাদপত্রসংশ্লিষ্ট একাধিক সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবিও উঠেছে বিভিন্ন সময়; কিন্তু এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে গ্রহণ বা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে গণমাধ্যমকর্মীদের বেতন বৃদ্ধির ওয়েজ বোর্ড, যেটি সরকারি নতুন বেতন স্কেলের সাথে কার্যকর হতো সে ধারা পাল্টে গেছে। গণমাধ্যমকর্মীদের জীবনে নেমে এসেছে দুর্বিষহ অবস্থা। এক দিকে সংবাদপত্রের আয় কমে যাওয়ায় পত্রিকাগুলো অলাভজনক হয়ে পড়েছে। নতুন উদ্যোক্তা আসছে না এ শিল্পে। অন্য দিকে সরকার রাষ্ট্রে চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত গণমাধ্যমশিল্পের প্রতি সুবিচার করতে পারছে না। ফ্যাসিবাদ আমলের এ ধারাবাহিকতা চলছে জুলাই-উত্তর দুই সরকারের সময়ও।
সরকারি বিজ্ঞাপনের হার নিয়েও রয়েছে বড় অসঙ্গতি। প্রস্তাব অনুযায়ী সংবাদপত্রে সরকারি বিজ্ঞাপনের বর্তমান হার ২০১৩ সালে নির্ধারিত এবং ২০১৯ সালে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এর পর দীর্ঘ সময়ে কাগজ, কালি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, অফিস ভাড়া এবং সাংবাদিক-কর্মচারীদের বেতনসহ প্রকাশনা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্য দিকে সরকারি ও বেসরকারি বিজ্ঞাপনের হারের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এ অবস্থায় সরকারি বিজ্ঞাপনের হার যৌক্তিকভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মতবিনিময় সভায় প্রতি কলাম-ইঞ্চি সরকারি বিজ্ঞাপনের হার ন্যূনতম তিন হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
এটি শুধু সংবাদপত্র মালিকদের বাণিজ্যিক দাবি নয়। সংবাদপত্রের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার সাথে বিজ্ঞাপনের আয় সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ অর্থপ্রবাহে চাপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে সংবাদপত্রের প্রকাশনা, কর্মসংস্থান এবং সংবাদ সংগ্রহের সক্ষমতার ওপর।
সরকারি বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্রে বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও এই বিপুল অর্থের কতটা কোন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর বা সরকারি প্রতিষ্ঠান খরচ করছে এবং কোন সংবাদপত্র কত টাকা পাচ্ছে- তার কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত হিসাব নেই। এমনকি একটি অর্থবছরে একটি সংবাদপত্র সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট কত টাকার বিজ্ঞাপন পেয়েছে, সেই তথ্যও এক জায়গায় সহজে পাওয়া যায় না। ফলে জনগণের অর্থে পরিচালিত সরকারি বিজ্ঞাপন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর- ডিএফপির বিজ্ঞাপন ও নিরীক্ষা শাখার সংস্কার নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভা এবং গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে দেয়া সংস্কার প্রস্তাবে সরকারি বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার এক দুর্বল চিত্র উঠে এসেছে। প্রস্তাবে সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টন পুনরায় কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা, ডিএফপির পূর্ণাঙ্গ মিডিয়া তালিকা অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব ‘শর্টলিস্ট’ বন্ধ করা এবং বিজ্ঞাপন, সার্কুলেশন, নিরীক্ষা ও বিল পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিএফইউজে মহাসচিবের বক্তব্য
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব ও বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সদস্যসচিব মুহাম্মদ কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকদের দশম ওয়েজ বোর্ড দেয়া হলে সংবাদপত্রগুলোর আয়ের পথ কোথায় তা নিয়ে সরকারকে অবশ্যই ভাবতে হবে। সংবাদপত্রের ওপর বিভিন্ন কর রয়েছে তা হ্রাস করা প্রয়োজন। সংবাদপত্রের জন্য একটি কর পরিশোধ করতে হয় যা গার্মেন্টস খাতের চেয়ে বেশি। এ ছাড়া বিজ্ঞাপনের রেট বৃদ্ধির পাশাপাশি যেসব পত্রিকা নামসর্বস্ব, যেগুলো প্রকৃত অর্থে গণমাধ্যমের পর্যায়ে পড়ে না সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। কারণ এসব পত্রিকা বিজ্ঞাপন ও সাপ্লিমেন্টগুলো নিয়ে যাচ্ছে। এতে গণমাধ্যম আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব দাবি বিএফইউজে’র পক্ষ থেকে বারবার তোলা হয়েছে। বর্তমান তথ্যমন্ত্রী এসব দাবিকে যৌক্তিক বলেছেন। তাই আমরা চাই এসব দাবি পূরণ এখনি করতে হবে।
বিএফইউজে’র এ নেতা বলেন, সংবাদপত্রশিল্পকে সেবামূলক শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে করপোরেট ট্যাক্স সর্বনিম্ন নির্ধারণ বা অপলোপনের কথা আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। নিউজপ্রিন্টের আমদানি শুল্ক ৫ থেকে ২ শতাংশে এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশের স্থালে ৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ ও অগ্রিম কর ৫ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। সামগ্রিক মিডিয়াকে শিল্প ঘোষণা করে এই শিল্পের বিকাশে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারি বিজ্ঞাপনের বিল দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া সংবাদপত্রের কারণে কোনো গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপন বন্ধ করাকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ডিইউজে সভাপতির বক্তব্য
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো: শহিদুল ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালের বিজ্ঞাপন রেট দিয়ে আজকের দিনে পত্রিকা চালানো সম্ভব না। বিষয়টি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিন দফা আলোচনা হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময় মন্ত্রীদের সাথে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। বিজ্ঞাপন রেট বৃদ্ধি না করলে সংবাদপত্রগুলো টিকে থাকতে পারবে না। দশম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নও সম্ভব হবে না। নতুন তথ্যমন্ত্রীর সাথেও আমরা সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে কথা বলার সময় বিজ্ঞাপন রেট নিয়ে কথা বলেছি। উনি আশ্বাস দিয়ে বিষয়টি নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনার জন্য রাজি হয়েছেন। চলতি মাসের মধ্যেই বিষয়টি তার সাথে আলোচনা করব।
বকেয়া বিজ্ঞাপন বিল প্রসঙ্গে শহিদুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটা আংশিক বকেয়া দেয়ার পর পর্যায়ক্রমে পরিশোধের আশ্বাস পাওয়া গিয়েছিল; কিন্তু নির্বাচনের পর তথ্যমন্ত্রী জহিরউদ্দিন স্বপন বললেন ২৪ আগস্টের পরের বকেয়া পরিশোধ করা হবে আগের নয়। আমরা মন্ত্রীর ওই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে বলেছি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পত্রিকার বিজ্ঞাপন বকেয়া নিয়ে চিন্তা করেন তাহলে সংবাদপত্রগুলো টিকে থাকবে না। স্বপন সাহেব পত্রিকাগুলোর কাছ থেকে বকেয়ার তালিকাও নিয়েছিলেন; কিন্তু সরকার ২৪ আগস্টের পরের বকেয়া নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। এই অবস্থায় সংবাদপত্র রক্ষায় সরকারের বিশেষ ভূমিকা নেয়া উচিত কি না জানতে চাইলে শহিদুল ইসলাম বলেন, নিঃসন্দেহে। মিডিয়া টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের বিজ্ঞাপন বকেয়া পরিশোধের সাথে সাথে জরুরি ভিত্তিতে বিজ্ঞাপনের রেট বৃদ্ধি করা উচিত। সরকার সরকারি সার্ভিসহোল্ডারদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করেছে তাই সাংবাদিকদের বেতনভাতা সুবিধার দিকে নজর দেয়া উচিত। বাজারে যে মূল্যস্ফীতির হার তাকে সাংবাদিকদের সাংবাদিকতা পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
৫০০ কোটি টাকার প্রবাহ- হিসাব কোথায়?
সরকারি প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে বছরে ৫০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের কথা সভায় উল্লেখ করা হলেও এই অর্থের সংবাদপত্রভিত্তিক বণ্টনের কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেস নেই। কোন মন্ত্রণালয় কত ব্যয় করছে, কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান কত বিজ্ঞাপন দিচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কোন সংবাদপত্র কত অর্থ পাচ্ছে- এই তথ্য বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন দফতরে থাকার কারণে সামগ্রিক চিত্র পাওয়া কঠিন।
এখানেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জবাবদিহির প্রশ্ন। রাষ্ট্রীয় অর্থের একটি বড় খাতের ব্যয় যদি সংবাদপত্রভিত্তিক, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ও অর্থবছরভিত্তিকভাবে প্রকাশযোগ্য না হয়, তাহলে সেই ব্যয়ের ওপর কার্যকর প্রশাসনিক ও সংসদীয় নজরদারি কতটা সম্ভব? সংস্কার প্রস্তাবে তাই সরকারি বিজ্ঞাপনের প্রতিটি অর্ডার, মূল্য, সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্র, প্রকাশের তারিখ, বিল এবং পরিশোধের তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।
১০-২৫ পত্রিকার ‘শর্টলিস্ট’
সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো- ডিএফপির পূর্ণাঙ্গ মিডিয়া তালিকা থাকার পরও কিছু সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে ১০, ১৫, ২০ বা ২৫টি সংবাদপত্রের ‘শর্টলিস্ট’ তৈরি করে বিজ্ঞাপন দেয়। এতে মিডিয়া তালিকাভুক্ত অনেক সংবাদপত্র বিজ্ঞাপন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে সংস্কার প্রস্তাবে অভিযোগ করা হয়েছে।
এই ব্যবস্থা শুধু বণ্টনে বৈষম্যই তৈরি করছে না; বিজ্ঞাপন পাওয়ার যোগ্যতার সাথে সার্কুলেশনকে অতিরিক্তভাবে যুক্ত করে সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতারও জন্ম দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। সমস্যাটি আরো গভীর হয় যখন প্রশ্ন ওঠে- কোন সংবাদপত্রকে বিজ্ঞাপন দেয়া হবে, সেটি নির্ধারণের ক্ষমতা কার? যদি প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব তালিকা তৈরি করতে পারে, তাহলে একই সংবাদপত্র এক প্রতিষ্ঠানের কাছে যোগ্য হলেও অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে কেন অযোগ্য হবে- তার কোনো অভিন্ন ও যাচাইযোগ্য ব্যাখ্যা থাকে না।
সংস্কার প্রস্তাবে তাই ডিএফপির মিডিয়া তালিকাভুক্ত সংবাদপত্র ও সাময়িকীকেই সরকারি বিজ্ঞাপনের জন্য যোগ্য বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পৌরসভাসহ সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মিডিয়া তালিকার বাইরে থাকা সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন না দেয়ার জন্য জরুরি নির্দেশনা জারির সুপারিশও রয়েছে।
সার্কুলেশন : বিজ্ঞাপনের যোগ্যতা নাকি ‘সংখ্যার যুদ্ধ’?
সরকারি বিজ্ঞাপন পাওয়ার সাথে সার্কুলেশনের সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠ, সার্কুলেশন যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও তত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সংস্কার প্রস্তাবে গত দুই দশকে সার্কুলেশন নির্ধারণ ও যাচাই নিয়ে নানা প্রশাসনিক উদ্যোগ সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত সমাধান না হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়েজ বোর্ড মনিটরিং কমিটি, গণমাধ্যম কমিশন, কর-ভ্যাট পরিশোধে কড়াকড়ি এমনকি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সার্কুলেশন তদন্তের মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও সমস্যা জটিল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
এখানে তৈরি হয়েছে একটি বিপজ্জনক যোগসূত্র- সার্কুলেশন যদি বিজ্ঞাপন পাওয়ার প্রধান মানদণ্ড হয়, আর সার্কুলেশন নির্ধারণ যদি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে, তাহলে সংবাদপত্রের অর্থনৈতিক টিকে থাকা পরোক্ষভাবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সাথে যুক্ত হয়ে যায়।
এ কারণে সংস্কার প্রস্তাবে সার্কুলেশন নির্ধারণ ও নিরীক্ষাকে আরো স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আইনগত ভিত্তিসম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ডিএফপির অডিট ব্যুরো অব সার্কুলেশন, বিজ্ঞাপন শাখার মিডিয়া তালিকাভুক্তি ও পরিদর্শনের কার্যক্রমকে আইনি ভিত্তি দেয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
সরকারের কাছে ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বকেয়া
সরকারি ক্রোড়পত্র প্রকাশের পর বিল পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও রয়েছে। সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০১৯-২০, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরের অতিরিক্ত ক্রোড়পত্রের বিল বাবদ সংবাদপত্রগুলোর পাওনা ছিল ৭৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয় তিন কিস্তিতে অর্থ বরাদ্দ দেয়ার পরও ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।
সংবাদপত্র শিল্পের জন্য এই বকেয়া কেবল হিসাবের একটি সংখ্যা নয়। কারণ পত্রিকা প্রকাশের ব্যয় প্রতিদিনই পরিশোধ করতে হয়। কাগজ, কালি, মুদ্রণ, পরিবহন ও জনবলের খরচের বিপরীতে সরকারি বিল বছরের পর বছর আটকে থাকলে কার্যকর মূলধনের ওপর চাপ বাড়ে।
৪ শতাংশ সার্ভিস চার্জ- তারও কেন্দ্রীয় হিসাব নেই
সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর ৪ শতাংশ সার্ভিস চার্জ আদায়ের বিধান রয়েছে বলে সংস্কার প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অর্থ ডিএফপির নির্ধারিত সরকারি কোডে জমা দেয়ার কথা থাকলেও বিজ্ঞাপনদাতারা সব ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে সরকারি বিজ্ঞাপন খাতে প্রকৃত ব্যয় এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট রাজস্বেরও পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। একটি সংবাদপত্র সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে মোট কত টাকার বিজ্ঞাপন পেল- সেই তথ্যও কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত নেই। অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু বিজ্ঞাপন বণ্টনের নয়; এটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতারও প্রশ্ন।
২০০৪-এর আগের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা ফেরানোর দাবি
সংস্কার প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হলো সরকারি বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র বিতরণ এবং বিল পরিশোধের দায়িত্ব আবার কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডিএফপির মাধ্যমে সম্পন্ন করা।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০০৪ সালের আগে এই কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় কোন সংবাদপত্র কত টাকার বিজ্ঞাপন পেয়েছে এবং বিজ্ঞাপনে সরকারের মোট ব্যয় কত- তার হিসাব রাখা সম্ভব ছিল। ২০০৪ সালের পর নির্বাহী আদেশ এবং পরবর্তী সময়ে পিপিআর-২০০৮-এর মাধ্যমে ক্রোড়পত্র ছাড়া অন্যান্য সরকারি বিজ্ঞাপন বিতরণ ও বিল পরিশোধের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর চলে যায়। প্রস্তাবদাতাদের অভিযোগ, এতে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ বেড়েছে এবং মিডিয়া তালিকাভুক্ত সংবাদপত্র বঞ্চিত হচ্ছে।
তবে শুধু কেন্দ্রীয়করণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার সাথে প্রয়োজন হবে স্বয়ংক্রিয় ও প্রকাশ্য ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা- যেখানে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে সংবাদপত্র পর্যন্ত পুরো অর্থপ্রবাহ দেখা যাবে।
বিজ্ঞাপন বন্ধের ভয়- সম্পাদকীয় স্বাধীনতার জন্যও হুমকি
সংস্কার প্রস্তাবে সরকারি বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার একটি আরো স্পর্শকাতর দিক তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারিপ্রতিষ্ঠানের কাছে বিজ্ঞাপন বিল বকেয়া থাকায় সংবাদপত্রের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। একই সাথে কোনো বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করলে ওই প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিতে পারে- এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকারি বিজ্ঞাপন আর শুধু রাজস্বের উৎস থাকে না; তা পরিণত হতে পারে সম্পাদকীয় চাপের একটি পরোক্ষ উপায়ে।
বিশেষ করে মফস্বল পর্যায়ে সংবাদদাতারা একই সাথে সাংবাদিকতা ও বিজ্ঞাপন সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করলে স্বার্থের সঙ্ঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে নীতির আওতায় আনা
সংস্কার প্রস্তাবে নিবন্ধিত অনলাইন সংবাদমাধ্যমকেও সরকারি বিজ্ঞাপনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। অনলাইন পোর্টালের ছাড়পত্র ও নিবন্ধন ব্যবস্থার পাশাপাশি সরকারি বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্য বিজ্ঞাপন নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ রয়েছে।
তবে এই খাতেও প্রয়োজন হবে স্বচ্ছ মানদণ্ড। প্রকৃত পাঠক বা ব্যবহারকারী পরিমাপ, নিবন্ধন, সম্পাদকীয় জবাবদিহিতা এবং বিজ্ঞাপনের অর্থের হিসাব- সবকিছুর জন্য অভিন্ন ব্যবস্থা না থাকলে নতুন খাতেও পুরনো অনিয়মের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থাকবে।
মিডিয়া তালিকা- ক্ষমতার হাতিয়ার নয়, স্বচ্ছ মানদণ্ডের বিষয়
বিগত সরকারের সময়ে মিডিয়া তালিকা থেকে বাদ পড়া সংবাদপত্রগুলোর পুনর্বহালসংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির দাবিও উঠেছে। এ ক্ষেত্রে মৌলিক প্রশ্ন হলো- একটি সংবাদপত্রকে সরকারি বিজ্ঞাপনের যোগ্য বা অযোগ্য করার মানদণ্ড কী?
আইন, যাচাইযোগ্য সার্কুলেশন, প্রকাশনার ধারাবাহিকতা, কর-ভ্যাট পরিশোধ, সাংবাদিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান এবং জনস্বার্থে ভূমিকার মতো যাচাইযোগ্য সূচক যদি মানদণ্ড হয়, তাহলে তা সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায় মিডিয়া তালিকাই প্রশাসনিক ক্ষমতার আরেকটি হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
সংস্কারের আসল পরীক্ষা
সরকারি বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার সংস্কারকে শুধু সংবাদপত্র শিল্পের আর্থিক সুবিধা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। এখানে জড়িয়ে আছে সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের স্বচ্ছতা।
বছরে ৫০০ কোটি টাকার বেশি সরকারি প্রচার ও বিজ্ঞাপন ব্যয় হলে প্রতিটি টাকার গতিপথ জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। কোন সংবাদপত্র কত পেল, কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান কেন দিলো, কার বিল কতদিন আটকে আছে এবং কোনো সংবাদপত্র কেন বঞ্চিত হলো- এসব তথ্য গোপন থাকার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
এ কারণে সংস্কারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত পাঁচটি জায়গায়- এক. সব সরকারি বিজ্ঞাপনের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেস; দুই. সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ‘শর্টলিস্ট’ বন্ধ; তিন. সংবাদপত্রভিত্তিক বরাদ্দ ও বিল পরিশোধের তথ্য প্রকাশ; চার. স্বাধীন ও প্রযুক্তিনির্ভর সার্কুলেশন অডিট; পাঁচ. বাস্তব উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিজ্ঞাপনের হার পুনর্নির্ধারণ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই- সরকার কি এমন একটি বিজ্ঞাপনব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে, যেখানে সংবাদপত্রকে বিজ্ঞাপন পেতে কোনো সরকারি কর্মকর্তার অনুগ্রহ বা কোনো প্রতিষ্ঠানের ‘শর্টলিস্টের’ ওপর নির্ভর করতে হবে না এবং জনগণের অর্থে দেয়া প্রতিটি বিজ্ঞাপনের হিসাব জনগণই যাচাই করতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ডিএফপির সংস্কার প্রস্তাব নিছক প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাংলাদেশের গণমাধ্যম অর্থনীতিতে সত্যিকারের কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করবে।


