নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক স্বার্থে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী- বিশেষ করে মুসলিমদের- ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর) প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। বিরোধীদের মতে, দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের এই বিতর্কিত উদ্যোগ ভারতের গণতন্ত্রকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে এবং ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদির সরকারের ক্ষমতা আরো সুসংহত করবে।
গত সপ্তাহে ভারতের সংসদে ৯টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিচালিত এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। এটি কয়েক দশকের মধ্যে ভারতের ভোটার তালিকার সবচেয়ে বড় সংশোধন উদ্যোগগুলোর একটি। যদিও সরকার এটিকে নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে ব্যাখ্যা করছে, বিরোধী দলগুলোর দাবি, এসআইআর মূলত একটি গোপন ‘নাগরিকত্ব জরিপ’, যার মাধ্যমে দরিদ্র ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে।
বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, বিজেপি এসআইআরকে ব্যবহার করে বিশেষ করে মুসলিম ভোটারদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছে। একই সাথে অভিযোগ উঠেছে, ভারতে অবৈধভাবে বসবাসরত বাংলাদেশী হিন্দুদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার নমনীয় অবস্থান নিচ্ছে।
বিজেপি প্রকাশ্যেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ গ্রহণ করেছে এবং ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তরের চেষ্টা করছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ। গত ১১ বছরে দলটির নীতি ও বক্তব্য ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়িয়েছে এবং মুসলিমবিরোধী বৈরিতা তীব্র করেছে। বর্তমানে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ২১টিতে ক্ষমতায় রয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দলটির প্রভাব নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে।
ভারতের বৃহত্তম বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী সংসদে অভিযোগ করে বলেন, এসআইআর হলো বিজেপির একটি বৃহত্তর ‘ভোট চুরির প্রকল্প’। তার ভাষায়, ‘আপনি যখন ভোট ধ্বংস করেন, তখন আপনি দেশের কাঠামো ধ্বংস করেন, আধুনিক ভারতের ধারণাকে ধ্বংস করেন।’ তিনি সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনগুলোতে ভোট প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ থাকার দাবিও করেন, যা বিজেপি অস্বীকার করেছে।
বিরোধীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এসআইআর কার্যত একটি গোপন জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি), যা আগে আসাম রাজ্যে বাস্তবায়িত হয়েছিল। সেখানে এনআরসি প্রক্রিয়ার ফলে লাখ লাখ মানুষ- অধিকাংশই মুসলিম- নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন, অনেকে আটক কেন্দ্রে পাঠানো হন বা নাগরিকত্ব ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হন।
এসআইআর নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) সরকার এই প্রক্রিয়াকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে অভিহিত করেছে। দলটির অভিযোগ, বিজেপি ‘চালবাজির মাধ্যমে’ রাজ্য দখলের চেষ্টা করছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেন, এসআইআর জনগণের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং মুসলমানদের মধ্যে নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কা তীব্র হয়েছে।
অন্য দিকে বিজেপি এসআইআর প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এটি ভোটার তালিকা থেকে মৃত, ভুয়া ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ ভোটারদের বাদ দেয়ার একটি নিয়মিত প্রশাসনিক উদ্যোগ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে বলেন, ‘শনাক্ত করুন, মুছে ফেলুন ও নির্বাসন’- এই নীতির মাধ্যমেই বিজেপি ভারতের গণতন্ত্র রক্ষা করছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, এসআইআর ভোটার তালিকা হালনাগাদের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, কমিশন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত নয়। চলতি বছরের শুরুতে বিহারে এসআইআর পরিচালনার পর ৬৫ লাখের বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, যা বিতর্ককে আরো ঘনীভূত করেছে।



