ধুঁকছে শতকোটি টাকার পাম্প হাউজ, অকার্যকর মনু প্রকল্প

Printed Edition

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

অনিয়মিত সেচ ও টানা অতিবৃষ্টির কারণে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ধান উৎপাদনের প্রধান ক্ষেত্র কাউয়াদীঘি হাওর আবারো স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। শতকোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়ন করা কাশিমপুর পাম্প হাউজটি পানিনিষ্কাশনে ভূমিকা রাখতে পারছে না। এতে ডুবে যাচ্ছে আমন ধানের চারা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মৎস্যখামার এবং অনাবাদি হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে কয়েকশ’ হেক্টর কৃষিজমি। ফলে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন এ অঞ্চলের শত শত কৃষক।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, যথাসময়ে পানি সেচ না দেয়ায় চলতি মৌসুমে কৃষকরা বোরো ফসল হারিয়েছেন। এরপর হাওরের উপরিভাগে আমনের বীজতলা তৈরি করলেও স্থায়ী জলাবদ্ধতায় সেগুলোও ডুবে গেছে। সরেজমিন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার হাওরপারের শ্যামাইজুড়ি গ্রামের কৃষক এস এম জামানের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, পাম্প হাউজ ঠিকমতো পানি সেচ না দেয়ায় আমরা বোরো ধান ঘরে তুলতে পারিনি। এখন আমন চাষের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আবারো ক্ষতির মুখে পড়েছি।

জুমাপুর গ্রামের কৃষক আবু তালেব বলেন, পাম্প হাউজের সক্ষমতা বাড়াতে সম্প্রতি জার্মানি থেকে নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন ও সামনের খাল খনন করা হলেও বাস্তবে আমরা কোনো সুফল পাচ্ছি না। উল্টো ধীরগতির পানিনিষ্কাশনের কারণে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। জগৎপুর গ্রামের মোস্তফা মিয়ার দাবি, জলমহাল ও মাছের ঘেরের ইজারাদারদের সুবিধা দিতে গিয়ে সময়মতো পাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে না। যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ কৃষকদের। উত্তর মিরপুরের তপু দাশ বলেন, আমার এক বিঘা জমির হালিচারা নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে চারা তৈরির সময় না থাকায় এবং জমি থেকে পানি না নামলে ক্ষেত অনাবাদি থেকে যাবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ১৯৮২ সালে মনু নদীর তীরে ফসল রক্ষা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাউয়াদীঘি হাওরের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়া হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল বোরো মৌসুমে সেচসুবিধা নিশ্চিত করা এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা। তবে দীর্ঘ দিনের অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা এখন প্রশ্নের মুখে।

সম্প্রতি টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের জগৎপুর, জুমাপুর, কান্দিগাঁও, শ্যামাইজুড়ি এবং রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর, উত্তরভাগ, মুন্সিবাজার, পাঁচগাঁও ও মনসুরনগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নতুন রোপণ করা আমনের চারা ও উঁচুতে থাকা পাকা আউশ ধান তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি অসংখ্য মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১০ থেকে ১৫টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।

এ বিষয়ে পাউবো মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালীদ বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কটের কারণে পাম্প হাউজের আটটি পাম্প একসাথে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ছয়টি সচল রয়েছে। এ ছাড়া পাশে বহমান কুশিয়ারা নদীর পানির স্তর উঁচুতে থাকায় এবং ৪৪ বছরের পুরনো পাম্পের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় দ্রুত পানি নামছে না। হাওরের পানির পরিমাপ ৮.৫ মিলিমিটারের স্থলে ৮.৬ মিলিমিটারে রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল সিকদার জানান, পাম্প হাউজের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে এবং পানিনিষ্কাশন চলছে। তবে বিদ্যুৎ সঙ্কট ও কুশিয়ারা নদীর পানির উচ্চতার কারণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।