সেই ৭ ইউএনওকে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে সংযুক্ত

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, ৮ ইউএনওর বদলির প্রজ্ঞাপনের পরের দিনই প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও একজন নির্বাচন কমিশনারের সাথে সাক্ষাৎ করে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা। তারা ভোটের ২২ দিন আগে ৮ ইউএনওকে বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে তারা কিছু জানেন না বলে জানান।

শামছুল ইসলাম
Printed Edition

গত ২০ জানুয়ারি দেশের ৮ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রজ্ঞাপনের পরের দিনই বদলি আদেশে অবমুক্তির তারিখ/তাৎক্ষনিকভাবে অবমুক্তির আদেশ অংশটুকু বাতিল করা হয়। প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হলে এর পরের দিন সকালে বদলির আদেশটিই বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। নির্বাচনের পরে এই ৮ কর্মকর্তার ৭ জনকে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর আগে ১লা ফেব্রুয়ারি এই কর্মকর্তাদের উপজেলা নির্বাহী অফিসার পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা। এতে একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের বদলির তদবির শুরু করেন। তাদের এই বদলির তদবিরে সহযোগিতা করেন নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইংয়ের যুগ্মসচিব পদমর্যাদায় কর্মরত থাকা দলটির সমর্থিত সিন্ডিকেট। এই দুই প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অন্ধকারে রেখেই তাদের বদলি করা হয়। এ ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়লে বদলি আদেশ বাতিল করা হয়। এরপর এই কর্মকর্তারা নিরপেক্ষভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেন। এর পরও ভোটের পর গত ১ মার্চ এই কর্মকর্তাদের উপজেলা নির্বাহী অফিসার থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং ৫ মার্চ তাদের সহকারী কমিশনার হিসেবে পদায়নের জন্য বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হয়।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, ৮ ইউএনওর বদলির প্রজ্ঞাপনের পরের দিনই প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও একজন নির্বাচন কমিশনারের সাথে সাক্ষাৎ করে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা। তারা ভোটের ২২ দিন আগে ৮ ইউএনওকে বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে তারা কিছু জানেন না বলে জানান। পরে তাদের প্রজ্ঞাপন দেখালে তারা অবস্থান পরিবর্তন করে অনুমোদনের বিষয়টি স্বীকার করেন।

২০ জানুয়ারি জারি করা আদেশে বরগুনার পাথরঘাটার ইউএনও ইসরাত জাহানকে ভোলার চরফ্যাসনে, চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের ইউএনও মো: আল-আমীনকে ফরিদপুরের নগরকান্দায়, পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার ইউএনও রেহেনা আক্তারকে বগুড়ার ধুনটে, হবিগঞ্জের বাহুবলের ইউএনও লিটন চন্দ্র দে-কে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে ইউএনও হিসেবে বদলি করা হয়েছিল।

এ ছাড়া বগুড়ার ধুনটের ইউএনও প্রীতিলতা বর্মনকে হবিগঞ্জের বাহুবলে, ফরিদপুরের নগরকান্দার ইউএনও মেহরাজ শারবীনকে নেত্রকোনার কলমাকান্দায়, নেত্রকোনার কলমাকান্দার ইউএনও মাসুদুর রহমানকে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় এবং ভোলার চরফ্যাসনের ইউএনও মো: লোকমান হোসেনকে বরগুনার পাথরঘাটার ইউএনও করা হয়েছিল।

এর আগে ১৭ জানুয়ারি বিকেলে জেলার কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুড়া বাজারে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমানের ভাই পরভেজসহ কয়েকজন মিলে সরকারি জায়গা দখল করে ঘর তুলছিলেন। নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুদুর রহমানকে স্থানীয়রা খবর দিলে তিনি গিয়ে ঘটনার সত্যতা পেয়ে পারভেজকে আটক করে। এ ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান গিয়ে ইউএনওকে শাসিয়ে বলেন, ‘এখানে কার অনুমতিতে এসেছেন। আমি এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, আমার ইউনিয়নে মোবাইলকোর্ট করতে হলে আমাকে বলতে হবে।’ ইউএনও প্রশ্ন করেন, এটা কোন আইনে আছে? তখন চেয়ারম্যান বলেন, এটা ইউনিয়ন পরিষদ আইনে আছে।

এ ঘটনায় পরদিন (১৮ জানুয়ারি) লেংগুড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ভূঁইয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এর একদিন পর ২০ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপণে কলমাকান্দা উপজেলার ইউএনও মাসুদুর রহমানকে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার ইউএনও হিসেবে বদলি করে।

তিন মাস আগে বগুড়ার ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন হওয়া প্রীতিলতা বর্মনকে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় বদলি করা হয়। বদলির আগের দিন তিনি ধুনট হাসপাতালের সরকারি জমি দখল করে দোকান নির্মাণের খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। এতে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইং এর সিন্ডিকেটকে দিয়ে তাকে সেখান থেকে বদলি করায়।

আল আমিন দীর্ঘ এক বছর অত্যন্ত সুনাম ও নিরপেক্ষতার সাথে জীবননগরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। স্থানীয় প্রভাবশালী পক্ষের সাথে বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে তারা একইভাবে এপিডি উইংয়ের সিন্ডিকেটকে দিয়ে তাকে সেখান থেকে বদলি করায়। একইভাবে ফরিদপুরের নগরকান্দার ইউএনও মেহেরাজ শারবীন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের কারণে একটা বিশেষ গোষ্ঠীর চক্ষুশূল হলে তাকেও বদলি করা হয়।