জ্বালানি তেলের মজুদ পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হওয়া উদ্বেগ এবং অস্বাভাবিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। একই সাথে যানবাহনভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য একটি দৈনিক কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি না হয় এবং মজুদ ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা যায়।
চট্টগ্রামে অবস্থিত বিপিসির প্রধান কার্যালয় থেকে জারি করা এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্প উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যবস্থার জন্য জ্বালানি তেল অপরিহার্য উপাদান। তবে দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা কিংবা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন সরাসরি দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিপিসি জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক বিঘেœর কারণে আমদানি কার্যক্রম কখনো কখনো বিলম্বিত হচ্ছে। এর সাথে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি মজুদ নিয়ে নেতিবাচক বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। এর ফলে অনেক ভোক্তা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যা বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
সংস্থাটির মতে, জ্বালানি সরবরাহে প্রকৃতপক্ষে বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি না হলেও অতিরিক্ত চাহিদা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে কিছু ডিলার স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি জ্বালানি উত্তোলনের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি কিছু ভোক্তা অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করে ব্যক্তিগতভাবে মজুদ করার প্রবণতা দেখাচ্ছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিপিসি।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় যানবাহনভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহের একটি নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই লিটার অকটেন বা পেট্রল সরবরাহ করা যাবে। প্রাইভেট কারের জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ লিটার জ্বালানি নেয়ার সুযোগ থাকবে। এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত সরবরাহ করা যাবে।
অন্য দিকে পিকআপ ভ্যান ও স্থানীয় বাসের জন্য প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল সরবরাহের অনুমতি দেয়া হয়েছে। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কনটেইনারবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল সরবরাহ করা যাবে। এই কোটা নির্ধারণের মাধ্যমে পরিবহন খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং একই সাথে অতিরিক্ত মজুদ ঠেকানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে বিপিসি।
বিপিসি আরো জানায়, ফিলিং স্টেশনগুলোকে জ্বালানি বিক্রির ক্ষেত্রে কঠোরভাবে নিয়ম মেনে চলতে হবে। প্রতিটি বিক্রির সময় গ্রাহককে পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে একটি নগদ স্মারক বা রসিদ দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে একই গ্রাহক পুনরায় জ্বালানি নিতে চাইলে আগের ক্রয়ের বিলের কপি জমা দিতে হবে। এর মাধ্যমে একই ব্যক্তি বা যানবাহনের নামে অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া ডিলারদের ক্ষেত্রেও কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি ডিলারকে নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী জ্বালানি বিক্রি করতে হবে এবং প্রতিদিনের মজুদ ও বিক্রির তথ্য সংশ্লিষ্ট ডিপো কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। কোনো ডিলার যদি এই নির্দেশনা অমান্য করেন বা অতিরিক্ত মজুদ তৈরি করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে বিপিসি।
সংস্থাটি আরো জানায়, দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে নিয়মিত তেলের চালান দেশে আসছে এবং প্রধান স্থাপনাগুলোতে তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এরপর রেলওয়ের ওয়াগন ট্যাংকার এবং সড়কপথে ট্যাংকার ট্রাকের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন ডিপো ও ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিপিসির মতে, সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক চাপ থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন চালান দেশে পৌঁছালে বাফার মজুদ আরো বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে বাজারে জ্বালানি সরবরাহ আরো স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ দিকে সরকারও জ্বালানি বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে জ্বালানি বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সঙ্কটের অজুহাতে যদি কোনো ফিলিং স্টেশন অতিরিক্ত দাম নেয় বা জ্বালানি গোপন করে রাখে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেলের মতো কৌশলগত পণ্যের ক্ষেত্রে আতঙ্ক বা গুজব দ্রুত বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে সাধারণ ভোক্তারা যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি সংগ্রহ করেন, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হয়। এতে প্রকৃত ভোক্তারা সমস্যায় পড়তে পারেন।
অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। তারা বলেন, সরকার ও বিপিসির নেয়া কোটা ব্যবস্থা সাময়িকভাবে চাহিদা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এ দিকে বিপিসি সাধারণ মানুষ ও ডিলারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন তারা অযথা আতঙ্কিত না হন এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ না করেন। সংস্থাটি জানায়, দেশে জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
সবশেষে বিপিসি জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সবার সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া এবং গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে বিরত থাকাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।


