শিক্ষা, সংস্কার, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমনসহ নানা বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করছে জামায়াত। দেশে-বিদেশে থাকা ৩০ জন বিশেষজ্ঞ ইতোমধ্যে ইশতেহারের খসড়া তৈরি করেছেন। দলটির আগামী কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভায় এ ইশতেহার চূড়ান্ত হলে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে। এ ছাড়া পলিসি পেপারও তৈরি করেছে জামায়াত।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেশে এবার বিএনপি ও জামায়াত জোট সমানে সমানে লড়ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে যেকোনো জোট বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ জন্য ভোটারদের মন জয় করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে দুই জোটই। তবে দেশের সচেতন ভোটাররা দেখতে চান কাদের হাতে ক্ষমতা গেলে তারা দেশটি সঠিকভাবে পরিচালিত করবে। অর্থনীতির সুরক্ষা, আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গঠন, কর্মসংস্থান তৈরি এবং দ্রব্যমূল্য কারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। দেশী-বিদেশী চাপ সামাল দেয়ার ক্ষমতা কাদের আছে। সংখ্যালঘু ও নারীদের নিরাপত্তা কারা দিতে পারবে। এ ছাড়া চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, খুন, ধর্ষণ কারা বন্ধ করতে পারবে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই সচেতন ভোটাররা তাদের সুচিন্তিত মতামত প্রদান করবেন।
জামায়াতে ইসলামীর নেতারা জানিয়েছেন, তারা একটি দেশের সামগ্রিক বিষয় মাথায় রেখেই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করছেন। একই সাথে এসব কিভাবে বাস্তবায়ন হবে তারও রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। সুন্দরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বল্প মেয়াদি, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। সরকার গঠনের পর প্রথম একশ’ দিনে কি করা হবে তাও উল্লেখ থাকবে ইশতেহারে। এ ছাড়া বছরওয়ারী এবং পাঁচ বছরে কী কী করা হবে তারও উল্লেখ থাকবে ইশতেহারে। মোট ৪১টি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এবং এর উপবিষয়ও থাকবে এর সাথে। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক এবং বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে ইশতেহারে পরিকল্পনাগুলো সাজানো হয়েছে। এজন্য কাজ করছেন দেশে এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী সুশিক্ষিত বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের অধিকারী ৩০ জনকে দায়িত্ব দিয়েছে জামায়াত। যারা ইতোমধ্যেই ইশতেহারের খসড়া তৈরি করে দলটির কাছে জমা দিয়েছেন। দলটির নীতিনির্ধারণী সভায় এটি পাস হলে চূড়ান্ত রূপ পাবে এবং জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
সংস্কার : অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন থেকে সংস্কারের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। যা গণভোটে পাস বা বাতিল হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে সেটি সংবিধানে যুক্ত হবে। জামায়াত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ তথা সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে এবং জামায়াত সরকার গঠন করতে পারলে সেগুলো সংবিধানে যুক্ত হবে এবং বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেবে।
শিক্ষা : দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যুগোপযোগী ও আধুনিক করতে চায় জামায়াত। উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয়ের সাথে কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে চায় দলটি। দেশে যাতে কোনো শিক্ষিত বেকার তৈরি না হয় সেজন্য নেয়া হবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি গড়ে তোলা, দেশে উন্নত গবেষণাগার তৈরি, জনগণকে ইসলামী ও বিজ্ঞান মনস্ক করার নানা পরিকল্পনা থাকবে ইশতেহারে।
কর্মসংস্থান : জামায়াত মনে করে বেকার ভাতা দেয়ার চেয়ে বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। তাতে সবার সম্মান ও দেশের অর্থনীতি উন্নত হয়। এ জন্য কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার, নতুন নতুন কলকারখানা তৈরি, ব্যাংকব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কর্মীদের উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানোসহ থাকবে নানা পরিকল্পনা।
দুর্নীতি দমন : জামায়াতের ইশতেহারের অন্যতম দিক থাকবে দুর্নীতি দমন। দলটি মনে করে দুর্নীতির কারণে দেশ পিছিয়ে পড়ছে। দেশের সম্পদের কোনো অভাব নেই, কিন্তু তার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। দুর্নীতির কারণে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে তা দেশে থাকলে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, কমে যাবে মূল্যস্ফীতি। এ ছাড়া দুর্নীতি না থাকলে দেশের সর্বত্র সুশাসন কায়েম হবে। এতে দেশের মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে।
অর্থনীতি : জামায়াত ইতোমধ্যেই সরকারের বাইরে থেকেই দেশে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। জামায়াতের নেতাদের উদ্যোগে ইসলামী ব্যাংক, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, এতিমখানাসহ নানা ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া দল পরিচালনায়ও জামায়াত অর্থনৈতিকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। একইভাবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় দলটি। বিশেষ করে ব্যাংকের সুষ্ঠু পরিচালনা, অর্থ পাচার এবং ঘুষ-দুর্নীতি রোধ, রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি, যাকাতভিত্তিক অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেয়াসহ থাকবে একঝাঁক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। যা জামায়াতের ইশতেহারে স্থান পাবে।
সংখ্যালঘু : জামায়াত মনে করে দেশে কোনো সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু নেই। সব নাগরিক দেশে সমান নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করবে। দলটির নেতারা মনে করেন, জামায়াত বিজয়ী হলে দেশে কেউ সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে নির্যাতিত হবে না। ব্যক্তিগত কোনো অপরাধ করে থাকলে সেটা মুসলিম-হিন্দু-খ্রিষ্টান সবার ক্ষেত্রেই আইন একই গতিতে চলবে। জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়টি পরিষ্কার করে তুলে ধরবে জামায়াত। এমনকি দলটি খুলনা থেকে এবারই প্রথম একজন হিন্দু ব্যক্তিকে তাদের প্রার্থী করেছে।
নারী : ‘নারী নেতৃত্ব হারাম’ সহ নানা ইস্যুতে জামায়াতকে নারীদের স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে প্রচার প্রচারণা থাকলেও দলটির নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। জামায়াত ক্ষমতায় এলে নারীরা দেশে সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করবে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। তারা বলছেন, বর্তমানে জামায়াতের যারা রাজনীতি করছেন তার অর্ধেকই নারী এবং শিক্ষিত। জামায়াতের মহিলা শাখা রয়েছে। ছাত্রীদেরও একটি সংগঠন রয়েছে যেখানে মেয়েরা নেতৃত্ব দিচ্ছে। তা ছাড়া জামায়াতের নারী নেত্রীরা বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। রয়েছেন চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার। ফলে জামায়াত কখনো নারীদের উন্নয়নে বাধা নয়, বরং সহায়ক হবে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। এজন্য নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মান, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইশতেহারে উল্লেখ থাকবে। এ ছাড়া কর্মজীবী মায়েদের জন্য কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার বিষয়ে ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমান।
কৃষি : দেশের অর্থনীতির প্রায় ৭০ ভাগ আসে কৃষিখাত থেকে। এজন্য এ সেক্টর নিয়ে জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। কৃষকরা যাতে সার, কীটনাশক নিয়ে সমস্যায় না পড়েন, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, সড়কে পণ্যবাহী ট্রাক যেন চাঁদাবাজির শিকার না হয় ইত্যাদি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হবে।
স্বাস্থ্য : স্বাস্থ্য খাতে ইতোমধ্যে জামায়াতের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট। দলের লোকদের উদ্যোগে ইতোমধ্যে অনেক হাসপাতাল, ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। তবে দেশ পরিচালনায় সব স্বাস্থ্যখাতকে রোগীবান্ধব করার উদ্যোগ, দুর্নীতিমুক্ত করা, সহজে ও স্বল্প ব্যয়ে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে ইশতেহারে।
ব্যবসা-বাণিজ্য : দেশের অর্থনীতির অন্যতম নিয়ামক ব্যবসা-বাণিজ্য। এ খাতে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। ঘাটে ঘাটে দুর্নীতি আর আমলাতান্ত্রিকতার নানা জাল। এসব ছিন্ন করতে চায় জামায়াত। এ জন্য ইশতেহারে নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হবে।
সংস্কৃতি : কিছু ব্যক্তি বলে থাকেন জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশের সংস্কৃতি জগতের লোক বেকার হয়ে যাবে। নাটক-সিনেমা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিনোদন জগত বাধাগ্রস্ত হবে ইত্যাদি। তবে জামায়াত নেতারা মনে করেন, এসব অপপ্রচার ছাড়া কিছুই না। জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশের সংস্কৃতি জগত আরো সমৃদ্ধশালী ও রুচিসম্মত হবে। জামায়াত কোনো জগতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। যার যার যে অবস্থান আছে সেখানে তারা দেশ ও জাতির জন্য কাজ করতে পারবে। সিনেমা-নাটক, বিনোদন সবই থাকবে। জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে এসব বিষয়ের বিস্তারিত উঠে আসবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের নয়া দিগন্তকে বলেন, মন্ত্রণালয় ও বাস্তবভিত্তিক খাতগুলো ধরে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। এ জন্য দেশে ও বিদেশে থাকা ৩০ জন বিশেষজ্ঞকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তারা ইতোমধ্যে খসড়া তৈরি করে আমাদের দিয়েছেন। এতে ৪১ বিষয়কে প্রাধান্য এবং এর উপ-বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে। দলের আগামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভায় পাস হলে এটি ২২ জানুয়ারির পর সংবাদ সম্মেলন করে জাতিকে জানানো হবে। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানিয়েছি সব দলের নির্বাচনী ইশতেহার যেন একই দিনে প্রকাশ করা হয়। তাহলে ভোটাররা তুলনামূলক আলোচনার সুযোগ পাবে বলেও মনে করেন তিনি। এ ছাড়া পলিসি পেপারও তৈরি করা হচ্ছে বলে জানান এ জামায়াত নেতা।



