ভারী বৃষ্টিপাত, উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় দেশের পর্যটন খাতে আবার বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কারণে সম্প্রতি কেবল পর্যটন খাতেই কয়েক শতকোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার, রূপসী সিলেট, সূর্যাস্তের দেশ কুয়াকাটা এবং তিন পার্বত্য জেলা- রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান।
যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং পর্যটন স্পটগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ খাতের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হাজার হাজার ব্যবসায়ী এবং কর্মী চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
জেলাভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতি ও বর্তমান পরিস্থিতি
কক্সবাজার : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া, পেকুয়া ও রামুসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন অংশ এবং প্রধান সংযোগ সড়কে তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় পর্যটকরা আগাম ভ্রমণ বাতিল করেছেন। কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির মতে, শহরের চার শতাধিক হোটেল ও রিসোর্টের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়ে গেছে। ফলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিচ-বাইক ও হস্তশিল্পসহ সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার আর্থিক লোকসান হচ্ছে।
সিলেট ও সুনামগঞ্জ : সাম্প্রতিক বন্যার প্রভাবে গোয়াইনঘাটের জাফলং, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট এবং কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথরে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ ঘোষণা করে স্থানীয় প্রশাসন। টাঙ্গুয়ার হাওরের হাউজবোট ব্যবসায়ীরাও আগাম বুকিং বাতিল করে অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় কেবল সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলেই পর্যটন খাতে ৫০০ কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল, যার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন দুর্যোগ পর্যটন খাতকে ফের ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম (খাগড়াছড়ি, সাজেক ও বান্দরবান) : রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক প্লাবিত হওয়ায় পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। খাগড়াছড়ি-বাঘাইছড়ি সড়কের বাঘাইহাট এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে সাজেক ভ্যালির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যার ফলে সেখানে ভ্রমণরত শত শত পর্যটক আটকা পড়েন। অন্য দিকে পাহাড়ধসের ঝুঁকি এবং নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে বান্দরবানের মেঘলা, নীলাচল ও দেবতাকুমের মতো জনপ্রিয় কেন্দ্রগুলোতে পর্যটক যাতায়াত সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
দুর্যোগের ধরন ও ক্ষয়ক্ষতি ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশ্লেষকদের মতে, বিগত কয়েক বছরে বন্যার ধরন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভৌগোলিক এলাকায় পরিবর্তন এসেছে : ২০২৩ সালে রেকর্ড বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়। ২০২৪ সালের মে-জুনের দীর্ঘমেয়াদি বন্যায় সিলেট বিভাগ ও পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যে কেবল সিলেটেই ক্ষতি ৫০০ কোটি টাকার বেশি; বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে কক্সবাজার, সাজেক ও সিলেট এর মধ্যে প্রতি বছর কক্সবাজারেই ব্যবসা ব্যাহত ১০০-১৫০ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক বন্যায় শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরবর্তী সঙ্কট মোকাবেলা এবং পর্যটন খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ( টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশী নয়া দিগন্তকে জানান, ‘দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া মাত্রই পর্যটকদের আস্থা ফেরাতে বিশেষ ছাড় এবং জোরালো প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে। তবে মাঠপর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যটন ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার জন্য সরকারি ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয়া জরুরি।’ এ ছাড়াও বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রেখে মেরিন ড্রাইভসহ পাহাড়ি এলাকার সংযোগ সড়কগুলো দুর্যোগসহনশীল করে পুনর্নির্মাণ করা এবং পর্যটকদের আগাম সতর্কবার্তা দেয়ার জন্য আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।



