বরিশাল ব্যুরো ও ফরিদপুর প্রতিনিধি
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ৫ আগস্টের পর গুপ্ত সংগঠনের ব্যক্তিরা এখন জালিম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই জালেমদের নেতা নারীদেরকে নিয়ে কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করেছে। তাদের কাছ থেকে এ দেশের নারীরা নিরাপদ নয়। এসব লোক যদি নির্বাচিত হয় তাহলে দেশের মানুষের দুর্বিষহ জীবন শুরু হবে। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি নিশিরাতের ও আমি-ডামির নির্বাচন। সেসব দিনের অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-জনতা চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়েছে।
গতকাল বুধবার বরিশাল বিভাগীয় জনসভায় তারেক রহমান আরো বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বরিশাল ভোলা ব্রিজ করতে হবে, নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অনেক কাজ বাকি আছে, এসব কাজ করতে হলে বিএনপিকে বিজয়ী করতে ধানের শীষে ভোট দিতে হবে।
কৃষকদের সহযোগিতার জন্য হিমাগার প্রতিষ্ঠা ও কৃষি কার্ড প্রদান করার আশ্বাস দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করা হবে। চিকিৎসা সুবিধা গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেয়া হবে। বাংলাদেশের নারী ও যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের আওতায় নিয়ে আসা হবে। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করে ক্রীড়াঙ্গনকে শক্তিশালী করা হবে।
গতকাল দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে জনসভা মঞ্চে উপস্থিত হন তারেক রহমান। বেলা ১টা ৫ মিনিট থেকে প্রায় ৩০ মিনিট বক্তব্য রাখেন তিনি। এরআগে বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে হেলিকপ্টারে বরিশাল স্টেডিয়ামের আউটার মাঠে অবতরণ করেন তারেক রহমান। পরে গাড়িবহর নিয়ে তিনি জনসভার মঞ্চে পৌঁছান। সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে নেতাকর্মীরা স্লোগানে স্লোগানে তাকে স্বাগত জানান।
তারেক রহমান মঞ্চে আসার আগেই লাখো জনতার উপস্থিতিতে বেলসপার্কের বিশাল মাঠ কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে হাজার হাজার বিএনপি নেতাকর্মী খণ্ড খণ্ড মিছিলসহ জনসভাস্থলে এসে উপস্থিত হন। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বরিশাল মহানগর বিএনপির আহবায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান আরো বলেন, গত ১৫ বছর ভোটাধিকার লঙ্ঘনের কারণে দেশের জনগণ নিপীড়ন, গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, যারা নিজেদের দেশের মালিক মনে করত, তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এখন জনগণই দেশের প্রকৃত ক্ষমতার উৎস। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী দেশ পরিচালনার জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করবে।
জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, স্বৈরাচার সরকারের সাথে তারা প্রতিবারই একসাথে ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা হলো মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। ৭১, ৮৬, ৯৬সহ বিগত ১৫ বছর কাদের সাথে ছিলেন তারা।’
তিনি গুপ্তদের সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনের আগে অনৈতিক কাজ করলে কেউ সৎ শাসন দিতে পারবে না। ভোটের দিনে কেউ ষড়যন্ত্র করলে তা জনগণের শক্তিতেই ব্যর্থ হবে। ভোটাধিকার হাইজ্যাক করতে দেয়া যাবে না।
তারেক রহমান জুলাই আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে বলেন, ‘শহীদদের রক্তের বিনিময়ে গণতন্ত্র পুনর্গঠন করতে হবে। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র একসাথে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং এতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’
নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নারীদের ঘরে বন্দী রেখে দেশ এগোতে পারে না। নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালুর প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। ইসলামের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, বিবি খাদিজা (রা:) ছিলেন কর্মজীবী নারী। তিনি নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান তুলে ধরেন।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর অব: হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, একটি দল বিএনপির বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছে। স্বাধীনতা নিয়ে উল্টা-পাল্টা কথা বলছেন। স্বাধীনতা নিয়ে মিথ্যাচার বন্ধ করুন। তারুণ্যের অহঙ্কার তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামীর বাংলাদেশ হবে সমৃদ্ধির বাংলাদেশ। আমরা সেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখতে চাই।
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ১৭ বছর পর আপনাদের চেয়ারম্যান আপনাদের কাছে এসেছে। যার প্রতিক্ষার জন্য আপনারা জেল খেটেছেন, হামলা মামলার শিকার হয়েছেন। আজ সেই চেয়ারম্যান বরিশালে। তারুণ্যের অহঙ্কার তারেক রহমানের আগামীর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ১২ তারিখ সারাদিন ধানের শীষে ভোট দিন।
জনসভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বরিশাল সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো: মজিবর রহমান সরোয়ার, বরগুনা-২ আসনের প্রার্থী নুরুল ইসলাম মনি, বরিশাল-১ আসনের প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন, বরিশাল জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল হোসেন খান, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান ও মাহবুবুল হক নান্নু, জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না, সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান, ইলেন ভুট্টো, পিরোজপুর-২ আসনের প্রার্থী আহমেদ সুমন সোহেলসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার ও জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহীন।
কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান জুলাই গণ-অভ্যুথানের নায়ক আপসহীন নেতা তারেক রহমান। তার হাত ধরেই আগামীর বাংলাদেশ হবে স্বপ্নের বাংলাদেশ।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, সারা দেশে তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা দেখে বোঝা যাচ্ছে তারেক রহমান ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন। এই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের ভোলাবাসীর দাবি ভোলা-বরিশাল সেতু ও মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণ করে দিবেন।
গণঅধিকার পরিষদের চেয়ারম্যান ভিপি নরুল হক নুরু বলেন, কোন উগ্রপন্থী বাহিনীর হাতে যেন ক্ষমতা চলে না যায়। সেজন্য দেশের স্বার্থে ধানের শীষে ভোট দিন।
জনসভায় বরিশাল বিভাগের ৬ জেলার ২১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৯ জন বিএনপি প্রার্থীর হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দেন তারেক রহমান।
পাশাপাশি বিএনপি জোটের শরিক দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সভাপতি ও ভোলা ১ (সদর) আসনের প্রাথী ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের প্রার্থী নুরুল হক নূরকেও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন তারেক রহমান।
আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, তারেক রহমান বলেছেন, এই যে স্বাধীনতা, জনগণের ভোটের অধিকার, জনগণের কথা বলার অধিকার, এর বিরুদ্ধে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে। এই ষড়যন্ত্র যারা করছে, জনগণ তাদের গুপ্ত নামে ডাকে। কারণ জনগণ দেখেছে কখনো সময় হয় এ দিক, আবার কখনো সময় হয় ও দিক! এদের যে শুধু রূপের পরিবর্তন হয় তাই না, জনগণকে তারা কিভাবে অপমান করে তাও দেখেন। গতকাল দুপুরে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এ কথা বলেন।
জনগণের ওপর যে তাদের আস্থা নেই তার দু’টি প্রমাণ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এই যে গুপ্তের দলের প্রধান, তিনি এ দেশের খেটে খাওয়া মা-বোনদের নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর একটি কথা বলেছেন, তা আপনারা দেখেছেন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যেই রাজনৈতিক দলের প্রধান দেশের খেটে খাওয়া মা-বোনদের সম্পর্কে এমন নোংরা চিন্তা করে থাকেন, তাদের কাছ থেকে কি আমরা ভালো কিছু আশা করতে পারি? পারি না। এটির প্রমাণ আমরা ৭১ সালেও দেখেছি। ৭১ সালে তাদের বিতর্কিত ভূমিকার জন্য এ দেশের লক্ষ লক্ষ নারী লক্ষ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি হয়েছিল। এদের কাছ থেকে জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। তারা মুখে বলে এক কথা আর কাজে করে আরেক কথা।
তারেক রহমান বলেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের পেছনে রেখে আমরা কোনোভাবেই সামনে এগোতে পারবোনা। এই নারী গোষ্ঠীকে আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। সেকারণে খেটে-খাওয়া প্রত্যেকটি গৃহিনীরা কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই, যার মাধ্যমে প্রতি মাসে তাদের সরকারের পক্ষ থেকে একটি সহযোগিতা প্রদান করা হবে। তিনি বলেন, বিএনপি দেশের কৃষক ও যুবসমাজের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিবে। কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ডের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি কলকারখানা গড়ে তুলে যুবকদের কর্মসংস্থান করা হবে।
জনসভায় তারেক রহমান বৃহত্তর ফরিদপুরের পাঁচ জেলার ধানের শীষের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদের বিজয়ী করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে গড়ার জন্য বিএনপির একটি পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জনগণেরও একটি পরিকল্পনা থাকা দরকার। সেই পরিকল্পনা হলো ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থীকে জয়ী করা। কারণ, দেশকে গড়ে তোলার জন্য যে কথা আমরা বলেছি, জনগণের সমর্থন ছাড়া কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন করতে আমরা পারবো না।
এ সময় তারেক রহমান ফরিদপুরের নদীভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়ে বলেন, বিএনপি সরকার গঠন হলে আগামী দিনে আমরা পদ্মা ব্যারেজ করবো। তিনি বিএনপির স্বাস্থ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, আমরা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলবো যাতে জনগণ ঘরে বসেই চিকিৎসা সেবা পাবে।
ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেস আলী ঈসার সভাপতিত্বে এসময় আরো বক্তব্য দেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফরিদপুর-২ আসনের প্রার্থী শামা ওবায়েদ ইসলাম, শরীয়তপুর-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী নূরউদ্দিন অপু, ফরিদপুর-৩ আসনের প্রার্থী চৌধুরী নায়াব ইউসুফ, ফরিদপুর-৪ আসনের প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাবুল প্রমুখ। এ সময় মঞ্চে গোপালগঞ্জ-১ আসনের প্রার্থী সেলিমুজ্জামান সেলিম, রাজবাড়ীর আলী নেয়াজ খৈয়াম, হারুন অর রশীদসহ বৃহত্তর ফরিদপুরের পাঁচ জেলার বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জ জেলা থেকেও নেতাকর্মীরা যোগ দেন।



