ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবি

দেশবাসীকে শাহবাগে জড়ো হওয়ার আহ্বান ইনকিলাব মঞ্চের

Printed Edition
ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের অবরোধ : নয়া দিগন্ত
ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের অবরোধ : নয়া দিগন্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

জুলাই বিপ্লবী ও ইনকিলাব মঞ্চের শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে ইনকিলাব মঞ্চ। এ সময় রাতভর অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় সংগঠনটির সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। একই সাথে বিচারহীনতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে দেশের সাধারণ মানুষকে শাহবাগে এসে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ঢাবি শাখা ইনকিলাব মঞ্চ। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাহবাগ মোড়ে এসে অবস্থান নেয়। এতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মী, সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন। অবস্থান কর্মসূচির ফলে শাহবাগ এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং সময় গড়ানোর সাথে সাথে সেখানে ব্যাপক জনসমাগম সৃষ্টি হয়। রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছিল। বিক্ষোভ সমাবেশে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘আমরা সবাই হাদি হবো, গুলির মুখে কথা কবো’, ‘বাকশালিদের আস্তানা ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘দালালি আর করিস না, পিঠের চামড়া থাকবে না’ ‘বিচার বিচার চাই, হাদি হত্যার বিচার চাই’ প্রভৃতি স্লোগান দেয়া হয়।

অবরোধ কর্মসূচিতে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার আদায়ের দাবিতে বাংলাদেশের জনগণকে শাহবাগে এসে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার জনগণের সামনে এসে জবাবদিহি না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই জায়গা জনগণ ছাড়বে না।’

তিনি বলেন, হাদি ভাইকে গুলি করার আজ ১৪তম দিন, তার শাহাদতের অষ্টম দিন পার হয়েছে। আমরা অনেক ধৈর্য ধরেছি। কিন্তু রাষ্ট্র কি এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো আশ্বাস দিতে পেরেছে? রাষ্ট্র যদি একজন নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় এবং হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সেই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। রাষ্ট্র রক্ষার দায়িত্ব জনগণের নয়, সরকারের। জনগণ বারবার রক্ত দিয়ে এই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ঢাকবে, এটি হতে পারে না।

তিনি বলেন, শাহবাগের এই জমিন শহীদ ওসমান হাদির রক্তে ভিজে আছে। অথচ এখন কেউ কেউ এসে আন্দোলনকারীদের নির্দেশ দিতে চায়- কী করা যাবে, কী করা যাবে না। আমরা দেখছি, আপনারা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে হাজিরা দেন। কিন্তু জনগণের সামনে এসে জবাব দিতে ভয় পান। ঘোষণা দিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব বলেন, সরকারের উপদেষ্টারা শাহবাগে এসে জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে জবাব না দেয়া পর্যন্ত এই অবরোধ চলবে। প্রয়োজনে শাহবাগে রাত্রিযাপন ও অনশন কর্মসূচিও চলবে।

ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, যে ভাইয়ের কণ্ঠে আমরা রাজপথে স্লোগান শুনতাম, আজ তাকে কবরে রেখে এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হচ্ছে। এটি পুরো ইনকিলাব টিমের জন্য অপূরণীয় শোক। তিনি আরো বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশে অসংখ্য নেতা তৈরি হয়েছে, কিন্তু ওসমান হাদি নিজেকে কখনো নেতা বলেননি। সবসময় ‘কর্মী’ পরিচয়ে থেকেছেন। নেতৃত্ব দাবি করা সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার ভাই ওসমান হাদি নিজেকে কখনো নেতা বলেননি। তিনি বলতেন, আমি ইনকিলাবের একজন কর্মী। এ চরিত্রই তাকে মানুষের নেতা বানিয়েছে। মৃত্যুর পরও তিনি আমাদের শক্তি, আমাদের স্লোগান, আমাদের লড়াই।

বিচারপ্রক্রিয়ায় অগ্রগতির শূন্যতা নিয়ে তিনি প্রশাসন ও সরকারের দিকে সরাসরি তীর ছোড়েন। তিনি জানান, হাদির মৃত্যুর পর খুনিদের অবস্থান, পলায়ন বা দেশে থাকা নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে স্পষ্ট কোনো চিত্র নেই। গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বও আমাদের পালন করতে হচ্ছে। এমন একটা সরকারকে বাংলাদেশের মানুষের টাকায় বসিয়ে রেখে লাভ কী?

এ সময় বিচারের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কিছু পক্ষের ‘মব’ বা বিশৃঙ্খলা হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জুমা বলেন, একটি মহল আমাদের এই ন্যায়বিচারের দাবিকে মব বলে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। আমি পাল্টা প্রশ্ন করি, বাংলাদেশে যদি মব করে ফাঁসিতে ঝোলানো যায়, তাহলে আমরা যখন শহীদের খুনিদের বিচারের দাবি করি, সেটি মব হবে কেন? আমরা বিশৃঙ্খলা করতে আসিনি। ইনকিলাব মঞ্চের কোনো কর্মসূচিতে সহিংসতার রেকর্ড নেই। নির্বাচন পেছানোর জন্য সহিংসতার যে অজুহাত দাঁড় করানো হচ্ছে, সেটি বিচার আটকে রাখার কৌশল। শহীদের রক্তের ইনসাফের দাবিকে থামানোর কৌশল। খুনি যত বড় শক্তিই হোক, তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আপনাদের প্রতি দায়িত্ব দিচ্ছি, যদি কেউ বিশৃঙ্খলা করতে আসে, তাকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেবেন।

জুমা আরো বলেন, শাহবাগ সাক্ষী থাকুক যতক্ষণ পর্যন্ত শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ভাইয়ের বিচার না হবে, আমরা রাজপথ ছাড়ব না। ইনসাফ না পাওয়া পর্যন্ত আমরা এখানেই থাকব। শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার এই বাংলার জমিনেই হবে। এই বিচার শাহবাগ থেকেই আদায় হবে।

অবস্থান কর্মসূচি থেকে ইনকিলাব মঞ্চ তাদের পূর্বঘোষিত তিন দফা দাবি আবার তুলে ধরে। দাবিগুলো হলো- ১. দ্রুত বিচারিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার সম্পন্ন করতে হবে; ২. হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে এফবিআই বা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পেশাদারি গোয়েন্দা সংস্থাকে যুক্ত করতে হবে এবং ৩. সিভিল ও মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করতে হবে এবং এই হত্যার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী ও আইন উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করতে হবে।

উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন শরিফ ওসমান হাদি। গুরুতর আহতাবস্থায় প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে দেশজুড়ে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন এ হত্যাকে ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে আসছে।