সংশোধন শেষ করে স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত পুঁজিবাজারের

ডিএসইতে ৪ ডিজিএমসহ বেশ কয়েকজনকে ছাঁটাই

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

আগের সপ্তাহে সূচক ও লেনদেনের বড় ধরনের উন্নতির পর গত সপ্তাহের শুরুতেই সংশোধনের কবলে পড়ে পুঁজিবাজার। টানা দুই দিন সংশোধনের শিকার হওয়া বাজারে হ্রাস পায় লেনদেন ও সূচক। কিন্তু এর পরই ফের ঘুরে দাঁড়াতে দেখা যায় বাজারগুলোকে। পরবর্তী তিনটি কর্মদিবসে আবারো স্বাভাবিক আচরণে ফেরার ইঙ্গিত ছিল দুই পুঁজিবাজারের। এ সময় আগের দুই দিন হারানো সূচকের একটি বড় অংশ ফিরে পায় বাজারগুলো। ফিরে আসতে শুরু করে লেনদেনের গতিও।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সক্রিয় থাকার পাশাপাশি সংশোধনও একটি অপরিহার্য বিষয়। আগের সপ্তাহে বাজারে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটলে মূল্যস্তরে যে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে তা থেকে বিনিয়োগকারীর একটি অংশ অবশ্যই মুনাফা তুলে নেবেন। আর এটাই সপ্তাহের প্রথম দকে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু মুনাফা তুলে নেয়া শেষ হলে ফের স্বাভাবিক আচরণে ফিরতে শুরু করে বাজারগুলো। তবে তাদের মতে, গত সপ্তাহের শেষ দকে এসে বাজার আচরণে কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। বিনিয়োগকারীরা ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন, যা পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এটি এক দিকে বাজারের ঝুঁকি হ্রাস করে অপর দিকে ভালো কোম্পানি বাজারে আসতে উৎসাহ পায়। দেশী-বিদেশী প্রকৃত বিনিয়োগকারীরাও বাজারে বিনিয়োগে উৎসাহী হন।

গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহে ৮ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট অবনতির শিকার ছিল। রোববার ৫ হাজার ৬৬১ দশমিক ৩৮ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে ৫ হাজার ৬৫২ দশমিক ৮২ পয়েন্টে স্থির হয়। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১১ দশমিক ৯৬ ও ৬ দশমিক ৮২ পয়েন্ট। সপ্তাহের প্রথম দুই কর্মদিবসে সূচকের বড় অবনতি ঘটলেও পরবর্তী তিনটি কর্মদিবসে হারানো সূচকের বড় অংশই ফিরে পায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজারটি।

সূচকের অবনতির কারণে এ সময় ডিএসইর লেনদেনেও বড় ধরনের অবনতি ঘটে। গত সপ্তাহে ডিএসই মোট ৪ হাজার ৭৫৭ কোটি ৮২ লাখ টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ২৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ কম। আগের সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেন ছিল ৬ হাজার ৪১৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। সপ্তাহটিতে ডিএসইর গড় লেনদেন ছিল ৯৫১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অথচ আগের সপ্তাহে বাজারটির গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ২৮৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। তবে সপ্তাহের শেষ দিনগুলোতে বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর পাশাপাশি লেনদেনও গতি ফিরে পায়। সপ্তাহের শেষদিন বাজারটির লেনদেন আবার ১ হাজার ১১০ কোটি টাকায় পৌঁছে।

এ দিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে একদিনে চারজন উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদমর্যাদার কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন কর্মীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আকস্মিক এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা। তাদের অভিযোগ, কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই ডেকে এনে চাকরি অবসানের চিঠি ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে ডিএসইর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দাবি, কোনো ব্যক্তিকে শাস্তির অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বরং প্রতিষ্ঠানকে আরো দক্ষ ও কার্যকর করার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি ‘রিসোর্স অপটিমাইজেশন’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ডিএসই সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেনারেল অ্যাডমিন বিভাগের ডিজিএম মো: আব্দুল লতিফ ও হোসনে আরা পারভীন, আইসিটি বিভাগের ডিজিএম শাহিন সারওয়ার এবং ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ডের সমন্বয়ক ডিজিএম আব্দুর রাজ্জককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। একই সাথে দু’জন সিনিয়র ম্যানেজার এবং নিম্নপদে কর্মরত আরো দু’জন কর্মকর্তাকেও অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এ তালিকায় আরো কিছু কর্মকর্তা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বর্তমানে ডিএসইর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাকরি হারানোর শঙ্কা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জানা যায়, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের একজনকে দেয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিএসইর জনবল পুনর্গঠন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তার চাকরি তাৎক্ষণিকভাবে অবসান করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের বর্তমান প্রয়োজন বিবেচনায় তার পদটি আর প্রয়োজনীয় নয় বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়। চিঠি অনুযায়ী, চাকরি অবসানের পর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ১২০ দিনের সমপরিমাণ মোট বেতন নোটিশের পরিবর্তে পাবেন। এ ছাড়া চলতি মাসের বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রাপ্য অর্থ, গ্র্যাচুইটি, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে পাওনা, অব্যবহৃত বার্ষিক ছুটির নগদ মূল্য এবং ডিএসইর নীতিমালা অনুযায়ী অন্যান্য সুবিধাও পরিশোধ করা হবে। এর পাশাপাশি সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে অতিরিক্ত দুই মাসের সমপরিমাণ মোট বেতন দেয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এ সুবিধা সম্পূর্ণভাবে ডিএসইর বিবেচনাধীন এবং এটি কোনো ধরনের আইনি অধিকার বা ভবিষ্যৎ নজির হিসেবে গণ্য হবে না।

চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, চূড়ান্ত পাওনার হিসাব প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সরবরাহ করা হবে এবং হিসাব পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে আপত্তি না জানালে সেটি চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কর, অগ্রিম, ঋণ কিংবা অন্য কোনো দায় সমন্বয়ের পর চাকরি অবসানের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে চেকের মাধ্যমে সব পাওনা পরিশোধ করা হবে। বলা হয়েছে, চাকরি অবসানের দিনই পরিচয়পত্র, ভিজিটিং কার্ড, অফিস নথি এবং প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সম্পদ ও গোপনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে হস্তান্তর করতে হবে। চাকরি শেষ হলেও গোপনীয় তথ্য সংরক্ষণ ও প্রকাশ না করার বাধ্যবাধকতা বহাল থাকবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসইর এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে আগে কখনো এভাবে কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়নি। হঠাৎ ডেকে এনে চাকরি না থাকার চিঠি ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে অধিকাংশ কর্মকর্তা আতঙ্কে রয়েছেন। কে কখন চাকরি হারান, সেই উদ্বেগ এখন সবার মধ্যে কাজ করছে। চাকরিচ্যুতদের কেউ কেউ ৩২ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ছিলেন।