নিজস্ব প্রতিবেদক
সুপ্রিম কোর্টের বিচারকক্ষে প্রবেশে কড়াকড়ির প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন দেশের সাংবাদিক ও গণমাধ্যম নেতারা। সুপ্রিম কোর্টের সব কার্যক্রমে অবাধ প্রবেশাধিকার পুনর্বহাল না করা হলে রাজপথে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
গতকাল বুধবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের মূল ফটকের সামনে ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের (এলআরএফ) আয়োজনে এ অবস্থান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সম্পাদক পরিষদের শীর্ষ নেতা এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিসহ দুই শতাধিক সংবাদকর্মী অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের মতে, প্রকাশ্য আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেয়া দেশের সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ করে।
বিচারকক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার ৭ মাস আগের এই সিদ্ধান্ত সংবাদ মাধ্যমগুলোতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ উন্মুক্ত বিচারব্যবস্থার মূলনীতির পরিপন্থী।
দাবির প্রতি সংহতি জানাতে কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি, নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবীর; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম; ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন; বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এমএম বাদশাহ; রিপোর্টার্স অ্যাগেইন্সট করাপশনের সভাপতি শাফিউদ্দীন আহমদ, রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসির সাধারণ সম্পাদক ইকরাম উদ্দৌলা প্রমুখ।
নুরুল কবীর বলেন, ওপেন কোর্টে বিচার করা বাংলাদেশের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। যে বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার ক্ষুণœ হলে সেটা সমুন্নত করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সেই বিভাগ নিজে যদি সেই অধিকার লঙ্ঘন করে এটা দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক এবং লজ্জাজনক ঘটনা। তিনি বলেন, একটা রক্তাক্ত গণ-অভ্যত্থানের পর লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। সেই সময়ে আদালতের কার্যক্রম গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষকে জানানোর কথা ছিল। আমরা লক্ষ্য করছি, বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব তথ্য জানানোর অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করছে। তিনি আরো বলেন, বিচারিক প্রশাসনকে মনে করিয়ে দিতে চাই, অতীতে বিভিন্ন সরকার আদালতের বা বিচার বিভাগের টুঁটি চেপে ধরলে সংবাদমাধ্যম বিচার বিভাগের পক্ষ অবলম্বন করেছে। সেই সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে যখন সর্বোচ্চ আদালত বাধার সৃষ্টি করে, তখন বিচার বিভাগের নেতৃত্বের গণতন্ত্র পরায়ণতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধানে দেয়া প্রকাশ্য আদালতে বিচারকার্য পরিচালনার নির্দেশনা লঙ্ঘন করে সংবিধান লঙ্ঘনের অপরাধে নিজেদের অভিযুক্ত করবেন না, এটা সম্পাদক পরিষদের আশা।
তিনি আরো বলেন, আমরা এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করার জন্য প্রধান বিচারপতির সাক্ষাৎ চেয়েও পাইনি। আশা করি প্রধান বিচারপতিসহ সম্মানিত বিচারপতিরা এ বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করবেন।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, যখন মানুষ অধিকার বঞ্চিত হয় অন্যায়ের শিকার হয়, তখন সে সর্বশেষ আস্থার জায়গা হিসেবে আদালতে যায় অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য। কিন্তু আদালত নিজেই যখন মানুষকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তখন মানুষ কোথায় যাবে?
আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির কঠোর সমালোচনা করে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেছেন, বিচার বিভাগে কোনো অনিয়ম বা অপকর্ম গোপন রাখতেই সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেয়া হচ্ছে কি না এমন প্রশ্ন ও সন্দেহ এখন পুরো জাতির মনে তৈরি হয়েছে। অবিলম্বে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিলে সব সাংবাদিক সংগঠনকে সাথে নিয়ে রাজপথে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
ডিআরইউ সভাপতি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ে আদালতের বিচারকদের ব্যবহার করে কিভাবে রায় লিখিয়ে তা কার্যকর করা হয়েছে, তা দেশের মানুষ দেখেছে। সেই অন্যায়ের পরিণতিতে অনেককে ফাঁসি ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ওইসব অপকর্মের সাথে জড়িত থাকার কারণে আজ অনেক সাবেক বিচারপতি জেল খাটছেন, অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আমরা চাই না ভবিষ্যতে কোনো বিচারকের ক্ষেত্রে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটুক।
প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে আবু সালেহ আকন বলেন, আদালতে বসে এমন কী কাজ হচ্ছে, যা জাতি জানতে পারবে না? কেন সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না? প্রধান বিচারপতি যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই সাংবাদিকদের সাথে একটি দূরত্ব তৈরি করছেন। এটি সমাধান না হলে আমরা ধরে নেবো এটি তার ব্যক্তিগত বিষয় এবং কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থেই সাংবাদিকতার কাজে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এলআরএফের সাবেক সভাপতি ও ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন বলেন, সংবিধানে প্রকাশ্য বিচারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে অথচ প্রধন বিচারপতি সাংবাদিকদের বের করে দিয়ে বিচার করছেন। জনগণকে বিচার বিভাগ সম্পর্কে জানার অধিকার দিতে হবে। আরো বক্তব্য দেন এলআরএফের সাবেক সভাপতি ইলিয়াস হোসেন, এম বদি-উজ-জামান, সাঈদ আহমেদ খান, আশুতোষ সরকার, ওয়াকিল আহমেদ হিরন, শামীমা আক্তার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক দিদারুল আলম, এলআরএফের সদস্য সঙ্কর মৈত্র, সাজেদুল হক প্রমুখ। এলআরএফের সাধারণ সম্পাদক আরাফাত মুন্নার সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন মুহাম্মদ ইয়াছিন। তিনি বলেন, আমাদের দাবি মানা না হলে শিগগিরই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকক্ষে প্রবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।


