মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। জমিজমা নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কলহ, পাওনা টাকা, পরকীয়া ও ব্যক্তিগত বিরোধসহ নানা কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই, এ পাঁচ মাসে জেলায় ৫৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসেই নিহত হয়েছেন ১৬ জন।
আগস্ট মাসেও একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ১৩ আগস্ট দুপুরে নগরীর মাসকান্দা এলাকায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনে রাব্বী (২৭) নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আটক আব্দুল খালেক (২৬) জমিজমা নিয়ে বিরোধের কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
এর আগে ৫ আগস্ট ফুলবাড়িয়ার এনায়েতপুর ইউনিয়নে আবু রায়হান (৪০) নামে কাস্টমসের এক সিপাহির ১৫ টুকরা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
জমি নিয়ে বিরোধে বেশি রক্তপাত
পুলিশ ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহে হত্যাকাণ্ডের বড় একটি অংশের পেছনে রয়েছে জমিজমা নিয়ে বিরোধ। জমির দখল, সীমানা নির্ধারণ, সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারা ও দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
গত ১১ জুলাই ফুলপুরের ধীতপুর গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ইউসুফ আলী (৭৪) নিহত হন। এর আগে ১ জুন সদর উপজেলার পরানগঞ্জ ইউনিয়নে জমি নিয়ে বিরোধে ছোট ভাইয়ের লাঠির আঘাতে আব্দুল বাছেদ (৩৫) নিহত হন। ২৯ এপ্রিল ফুলপুরে জমি লিখে না দেয়াকে কেন্দ্র করে আয়েশা খাতুন নামে এক বৃদ্ধাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে।
জুলাইয়ে ১৬ হত্যাকাণ্ড
জুলাই মাসে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। ৫ জুলাই গৌরীপুরের ভাংনামারী ইউনিয়নে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের হামলায় আব্দুল বারেক আকন্দ (৫৫) নিহত হন। ১১ জুলাই তারাকান্দার রোয়াপাড়া গ্রামে জমির আইল থেকে আড়াই বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিন ফুলপুরে জমি নিয়ে বিরোধে ইউসুফ আলী নিহত হন।
১২ জুলাই তারাকান্দার মাধবপুর গ্রামে ভাতিজার ছুরিকাঘাতে আক্রাম মিয়া (৫৫) নিহত হন। পরদিন হামলায় আহত তার ভাতিজার মা নূরজাহান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ১৮ জুলাই সদর উপজেলার চরঈশ্বরদিয়া এলাকায় অটোরিকশাচালক রাজীব মিয়াকে (২৫) হত্যা করে অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। একই রাতে গৌরীপুরের মইলাকান্দায় ছুরিকাঘাতে আব্দুল মান্নান ওরফে মন্নাফ (৬৫) নিহত হন।
তুচ্ছ বিরোধেও প্রাণহানি
জমির বিরোধের পাশাপাশি সামান্য টাকা ও ব্যক্তিগত বিরোধও হত্যাকাণ্ডের কারণ হচ্ছে। ২৩ মে মুক্তাগাছার রসুলপুরে তিন হাজার টাকা পাওনাকে কেন্দ্র করে শফিকুল ইসলাম নামে এক যুবককে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে। ১৪ এপ্রিল ফুলবাড়িয়ায় ১০ টাকার বিরোধে ভাতিজার ছুরিকাঘাতে আয়েশা খাতুন নামে এক নারী নিহত হন।
২০ মে গফরগাঁওয়ের পাগলা থানা এলাকায় গাছে বাঁধা অবস্থায় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, প্রাথমিক তদন্তে পরকীয়ার জেরে হত্যার তথ্য পাওয়া যায়। এ ঘটনায় দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়। ৪ মে ধোবাউড়ার দীঘিরপাড় এলাকায় দুলাল খাঁ নামে এক ব্যক্তির গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। ১০ মে মুক্তাগাছায় নিখোঁজ শিশু সাদমান রাফির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় অপহরণকারীরা মুক্তিপণ দাবি করেছিল বলে জানা যায়।
২ জুন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের চরঈশ্বরদিয়া এলাকায় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে রানা মিয়া (৩৩) নিহত হন। ৭ জুন গফরগাঁও উপজেলা সদরের মাজার রোডে দুর্বৃত্তদের হামলায় কলেজছাত্র নাহিয়ান রবিন (২৪) নিহত হন।
৯০ শতাংশ ঘটনায় গ্রেফতারের দাবি
জেলা পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চলছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, জমি ও পারিবারিক বিরোধের মতো বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকতে থানাগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জমি, টাকা ও পারিবারিক বিরোধের মতো বিষয় কিভাবে হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিরোধ আগেই শনাক্ত করে মীমাংসার উদ্যোগ এবং সামাজিকভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।



