ছয় মাসে সব সমস্যার শতভাগ সমাধান কঠিন

ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন বড় সাফল্য : মাহাদী আমিন

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের বড় সাফল্য হচ্ছে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা এবং নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন। তিনি বলেন, মাত্র ছয় মাসে সব সমস্যার শতভাগ সমাধান কঠিন বলে তবে বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতা রয়েছে। এই ছয় মাসে সরকারের সফলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, অভূতপূর্ব জনসমর্থন, সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাফল্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন, আর্থিক খাতে সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অবকাঠামো, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বতন্ত্র ভিন্নমাত্রিক নেতৃত্ব এই সরকারের বড় অর্জন। গতকাল সোমবার দুপুরে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখাপত্র এই মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীর সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান ও রুহুল কবির রিজভী, জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইলি জবি উল্লাহ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক এস এম আব্দুল আউয়াল উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মাহবুবা ফারজানা, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাছির জামাল, প্রধানমন্ত্রীর স্ক্রিপট রাইটার মাহফুজুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেসসচিব জাহিদুল ইসলাম রনি, মো: সুজাউদ্দৌলা, শাহাদাৎ স্বাধীন, সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক, আবদুল্লাহ আল মাহমুদ শাহরিয়ার ও আশরোফা ইমদাদ উপস্থিত ছিলেন। তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র ‘শাপলা’য় সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে এক মতবিনিময় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র ‘সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম এবং সাফল্যগুলোর একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মন্ত্রিসভার সদস্যগণ।

মাহদী আমিন বলেন, গত ছয় মাসের অজস্র জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী দেশজুড়ে যেখানেই গিয়েছেন ঠিক জনগণের ঢল নেমে এসেছে। জনগণের আস্থা এবং বিশ্বাসকে ধারণ করে বর্তমানে আমাদের যে সরকার সেটি বারবার জনগণের প্রতি দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ব এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। সরকারের এই ছয় মাসের সবচেয়ে যেটা ডিফারেন্ট একটা বিষয় চোখ করার মতো সেটা হচ্ছে, নির্বাচন ইশতিহারকে ধারণ করে সেখানকার প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য অবিরত কাজ করে চলেছে।

মাহাদী আমিন বলেন, গত ছয় মাসে বাক স্বাধীনতা, আইনের অনুশাসন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ মানবিক স্থাপন দেখেছি যেখানে একটি বারের জন্য কখনো কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন হয়নি। যেখানে আমরা দেখেছি সর্বোচ্চ বাকস্বাধীনতা অনেক সময় সেটা সীমা লঙ্ঘন করেছে। আমরা দেখেছি কিভাবে উসকানি দেয়া হয়েছে অশোভন আচরণ করা হয়েছে কিন্তু তারপরও সরকারের সর্বোচ্চ ধৈর্য এবং সহনশীলতার মাধ্যমে ঠিক যেভাবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদরীয় গণতন্ত্র এস্টাবলিশ করেছিলেন সেটিকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে জনগণের সরকার।

তিনি বলেন, গত ছয় মাসে আমরা দেখেছি অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং স্বতস্ফূর্ত জাতীয় সংসদ, যেখানে মাননীয় সংসদ সদস্যরা একে-অপরের আলোচনা করেছেন, সমালোচনা করেছেন, যৌক্তিকভাবে বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করেছেন। দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন যে সরকারের গঠনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনে শতাধিক অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করা হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সে আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে। সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধিত যে অধ্যাদেশ সেটিকে সংসদে আইনে রূপান্তরের মাধ্যমে সন্ত্রাসী একটি রাজনৈতিক সংগঠন যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মাহাদী আমিন সরকারের ১৮০ দিনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে বলেন, ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে যে বাংলাদেশকে আমরা নতুন করে পুনর্গঠন করছি, সেখানে মাত্র ছয় মাসে সব সমস্যার শতভাগ সমাধান করে ফেলা হয়তো কিছুটা দুরূহ, তবে একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই নির্বাচিত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারের রয়েছে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতা।

প্রধানমন্ত্রীর স্বতন্ত্র নেতৃত্বে কথা উল্লেখ করে বলেন, এই বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে তথাকথিত ভিআইপি সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে সাধারণ মানুষের মতো করে সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে এসেছেন। আমরা দেখেছি, তিনি বারবার তৃণমূলের মানুষের কাছে ছুটে যাচ্ছেন, কোদাল হাতে নিয়ে খাল খনন কর্মসূচিতে নেমে পড়ছেন, স্কুলের কোমলমতি শিশুদের পরম স্নেহে কোলে তুলে নিচ্ছেন। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তার অত্যন্ত সাদাসিধে ও মিতব্যয়ী জীবনাচার।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন আমরা করতে চাই কিন্তু সেই সংস্কার কমিশনকে যারা সাপোর্ট করবে ওইখানে যদি ভূত-টুত থাকে ওইটা ক্লিয়ার না করে করলে তো ভালো কাজ হবে না। একটু সময় লাগতেছে, শিগগিরই হবে ইনশাল্লাহ।

রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সামাজিক সুরক্ষা থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলো তিনি রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, একটি ভঙ্গুর স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার তথা জোটের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চার দিকে ছিল অরাজকতা, নৈরাজ্যের এক ধূসর পরিবেশ। কে কখন গুম হয়ে যাবে। কে কখন অদৃশ্য হবে তার কোনো ইয়ত্তা ছিল না। বিচারবহির্ভূত হত্যা লেগেই ছিল এবং প্রত্যেকটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন করার জন্য নির্বাচনী ইশতেহারে যে কথা বলা আছে সরকার সেই পয়েন্ট থেকে সরে আসে নাই। বরঞ্চ সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে এবং ইন দি মিন টাইম কিছু প্রক্রিয়াও আপনারা দেখেছেন কিছু কিছু কাজ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের প্রশাসনের আগের সরকারের ধজাবাহী কিছু ব্যক্তি এখনো রয়ে গেছেন তাদেরকে সে সমস্ত জায়গা থেকে চিহ্নিত করে সে সমস্ত জায়গা ক্লিনজিং অপারেশন করার একটা চেষ্টা আমরা করেছি এবং সেটা ধারাবাহিক অব্যাহত রয়েছে। এমন কিছু করা যাবে না যাতে দেশ এবং জাতির ক্ষতি হয়। বাট এট দি সেইম টাইম আমাদের এই প্রশাসনকে যেভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে সেখান থেকেও আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে গণমাধ্যমের যারাই কথা বলেছেন তারা সবাই আমাদের সরকারকে এবং প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসা করেছেন যে, এই প্রথম এ পর্যন্ত কোনো গণমাধ্যমে কোনো ধরনের কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব তারা অনুভব করেন নাই। সেই কারণে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে একাধিকবার তারা ধন্যবাদ জানিয়েছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন।। এই ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক করার জন্য গণমাধ্যম কমিশন গঠন করার জন্য তাদের আগ্রহ এবং আমাদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে কোনো অমিল নাই। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা অংশীদারদের সাথে বৈঠক করার উদ্যোগ নিয়েছি। এখন আমরা ওয়ার্কিং গ্রুপ করব। তারা একটা ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যানের ড্রাফট তৈরি করবেন। তারপর আমরা এটা মন্ত্রিসভার কাছে উপস্থাপন করব।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন, বর্তমান সরকার গত ছয় মাসে কী কাজ করেছে আমি বলি সেটি হচ্ছে এই রাষ্ট্র সমাজে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা, মানুষের সম্মান প্রতিষ্ঠা করা- এগুলো আমরা দেখিনি আগে ছিল না। আপনারা দেখেছেন মিরপুরে যখন শিশু রামিসা হত্যা হলো সেই শিশু রামিসার ঘরে প্রধানমন্ত্রী নিজে গিয়েছেন। এর মানে হচ্ছে মজলুমের ঘরে যখন সরকার প্রধান যান তখন বুঝতে হবে যে আসলে এমন বাংলাদেশে আমরা প্রত্যাশা করি যেখানে জনগণের কাছে রাষ্ট্র সরকার দায়বদ্ধ।

বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিশৃঙ্খলার মাঝে বর্তমান সরকারের ছয় মাস (১৮০ দিন) পূর্ণ করে দেশ পরিচালনা করতে পারাই একটি বড় সফলতা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। তিনি বলেন, আজকে বর্তমান সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হলো। বিগত সরকার যে জঞ্জাল ও ভঙ্গুর অবস্থায় দেশকে রেখে গিয়েছিল, সেই পরিস্থিতির মধ্যেও বর্তমান সরকার যে স্বাভাবিকভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারছে এটাই আমাদের কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি।