ভয়াবহ দাবানলের কবলে ফ্রান্স

Printed Edition
দক্ষিণ ফ্রান্সে দাবানল নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয় অগ্নি নির্বাপন বিমান
দক্ষিণ ফ্রান্সে দাবানল নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয় অগ্নি নির্বাপন বিমান

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন ফ্রান্স থেকে

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দাবানলের কবলে পড়েছে ফ্রান্স। চলতি বছরের শুরু থেকে দেশজুড়ে ১২ হাজার ৫০০টিরও বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ৪৪ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেলেও সর্বশেষ সরকারি তথ্য বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিমাণ এক লাখ হেক্টরেরও বেশি ছাড়িয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরোন্দ, লঁদ, অদ এবং ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলবর্তী এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা, একের পর এক তীব্র তাপপ্রবাহ এবং প্রবল শুষ্ক বাতাস আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দাবানল নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে হাজার হাজার দমকলকর্মী, সামরিক বাহিনীর সদস্য, স্বেচ্ছাসেবক এবং অগ্নিনির্বাপণ বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন। আগুন নেভাতে ব্যবহার করা হচ্ছে অগ্নিনির্বাপণ বিমান, হেলিকপ্টার এবং ভারী স্থলযান। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দুই লাখেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বহু সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি পর্যটন এলাকা সাময়িকভাবে জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

দাবানলের ফলে বনভূমির পাশাপাশি কৃষিজমি, আঙুরের বাগান, পশুপালন খামার এবং অসংখ্য বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবার তাদের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সম্পদ হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছে। ঘন ধোঁয়ায় বাতাসের মান বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোয় শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগীদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

সরকারের তরফে এ পর্যন্ত দাবানলে নিহতের কোনো আনুষ্ঠানিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন দমকলকর্মী আহত হয়েছেন এবং শতাধিক মানুষ ধোঁয়াজনিত শ্বাসকষ্ট ও তাপজনিত অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা নিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা সম্ভব হবে না।

দেশটির রাজধানী প্যারিসের বাসিন্দা সোফি মার্টিন বলেন, ‘এ ধরনের গরম আমরা আগে দেখিনি। বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ সব সময় ভাসছে। শিশুদের বাইরে খেলতে দিচ্ছিনা। আমরা বুঝতে পারছি জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি এখনকার বাস্তবতা।’ বোর্দো অঞ্চলের বাসিন্দা জ্যঁ-পিয়ের লরঁ বলেন, ‘আমাদের আশপাশের বনভূমি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আগুনে পুড়ে গেছে। অনেকে ঘর ছেড়ে পালিয়েছেন। কৃষকরা তাদের ফসল ও গবাদিপশু নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।’

ফ্রান্সের সরকার জানিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে দাবানল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত অগ্নিনির্বাপণ বিমান ও সরঞ্জাম ক্রয়, দমকল বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আগুন শনাক্তে স্যাটেলাইট ও ড্রোনভিত্তিক নজরদারি সম্প্রসারণ, বনাঞ্চলে অগ্নিনির্বাপণ রাস্তা ও জলাধার নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় জনগণকে দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চলে পুনঃবনায়ন কর্মসূচি এবং জলবায়ু সহনশীল বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিভিল প্রোটেকশন মেকানিজমের আওতায় প্রতিবেশী কয়েকটি দেশও ফ্রান্সকে বিমান, দমকলকর্মী ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, চলমান এই দাবানল শুধু ফ্রান্সের নয়, সমগ্র ইউরোপের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে ভবিষ্যতে দাবানলের ঝুঁকি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। তারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পরিবেশবান্ধব নীতি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলা করা কঠিন হবে।

আবহাওয়া বিভাগ আগামী কয়েক দিন আরো তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দিয়েছে। ফলে দাবানল নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রেখে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ফরাসি সরকার।