সংস্কার বাস্তবায়ন কোন পথে?

১৭০ সুপারিশের মধ্যে বাস্তবায়ন ৫৫

শামছুল ইসলাম
Printed Edition

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী কাঠামো সংস্কার দেশের রাজনীতিতে প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল অতীতের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অগণতান্ত্রিক প্রথা ভেঙে একটি নতুন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

এ প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। রাষ্ট্র পরিচালনায় মৌলিক পরিবর্তনের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, অর্থনীতি, জনপ্রশাসন, শ্রম, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাত পর্যালোচনা ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।

এসব সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার মোট ১৭০টি সুপারিশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সরকারের দেড় বছরের কার্যকালে এর মধ্যে মাত্র ৫৫টি সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে। আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে আরো ২৩টি সুপারিশ। সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

কোন মন্ত্রণালয় কতটা বাস্তবায়ন করেছে

সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি সুপারিশ বাস্তবায়ন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। শ্রম সংস্কার কমিশন ও নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এ মন্ত্রণালয় মোট ১৫টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করেছে।

আইন ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন এবং নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের ১১টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করেছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন এবং নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ বাস্তবায়ন করেছে আরো ১১টি সুপারিশ।

এ ছাড়া গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশে তথ্য মন্ত্রণালয় একটি, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ একটি, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি, শ্রমখাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে স্থানীয় সরকার বিভাগ একটি, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের ভিত্তিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় দু’টি, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ভিত্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ একটি, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের ভিত্তিতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পাঁচটি, জনপ্রশাসন ও নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দু’টি, শ্রম ও নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় তিনটি, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ একটি সুপারিশ বাস্তবায়ন করেছে।

বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক সংস্কার

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়ন করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ পুনর্গঠন করা হয়। এ বিষয়ে গত বছরের ১২ মে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

আইন ও বিচার বিভাগ যে ১১টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রধান বিচারপতি ব্যতীত অন্যান্য সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগে স্বাধীন কমিশন গঠন, আদালত ভবনের নিচতলায় ইনফরমেশন ডেস্ক স্থাপন, নারী ও শিশুদের জন্য আদালতে স্বতন্ত্র ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা, অনলাইনে সরকারি সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ, দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করা, সাক্ষী সুরক্ষা ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা, জেন্ডার সংবেদনশীলতা বিষয়ে পুলিশ, আইনজীবী ও বিচারকদের প্রশিক্ষণ, নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে বিদেশী নাগরিককে বিবাহকারী বাংলাদেশী নারীদের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন।

প্রবাসী শ্রম ও নারী সুরক্ষা

শ্রম সংস্কার কমিশন ও নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক জীবন বীমা চালু, আত্মীয়স্বজনের ভিসায় বিদেশে যাওয়া কর্মীদের নিজস্ব ভিসা প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ, নারী অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালু।

নারী ও শিশু বিষয়ক উদ্যোগ

নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পাঁচটি সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নারী উন্নয়ন বিষয়ক জাতীয় পরিষদ পুনর্গঠন, জাতীয় মহিলা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন একাডেমির সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিএনএ পরীক্ষাগার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ, কর্মজীবী নারীদের জন্য আবাসিক হোস্টেল ও শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র স্থাপন, নারীর সুরক্ষায় দেশব্যাপী সমন্বিত টোল-ফ্রি হটলাইন চালু।

নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংস্কার

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন এবং নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন সংশোধন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন, রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, ডাকযোগে ভোট প্রদানের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ।

ধীরগতির কারণ নিয়ে প্রশ্ন

সংস্কার কমিশনগুলোর পক্ষ থেকে বাস্তবায়নযোগ্য শতাধিক সুপারিশ আসলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত। বিশেষ করে যেসব সুপারিশ ‘আশু বাস্তবায়নযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত ছিল এবং নির্বাহী আদেশেই কার্যকর করা সম্ভব ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে বিলম্ব জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সংস্কার সংশ্লিষ্টদের মতে, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক জড়তাই এ ধীরগতির অন্যতম কারণ। যেকোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা পরিবর্তন সহজে মেনে নিতে চায় না। জনপ্রশাসন, পুলিশ কিংবা মাঠ প্রশাসনের সংস্কার প্রস্তাব বিদ্যমান ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দিতে পারে এ আশঙ্কা থেকেই ভেতরে ভেতরে নীরব কিন্তু শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে গতি কমে এসেছে।