রফতানি ও রেমিট্যান্স খাত নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত অর্থবছরে এ দুই সূচকেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি থাকলেও ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকের চাহিদা হ্রাস, বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নিয়োগের ধীরগতির কারণে আগামী মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে চাপ সৃষ্টির শঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সাথে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথগতিও বাংলাদেশের রফতানি ও প্রবাসী আয়ে নতুন ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে জুন মাসে রেমিট্যান্স নেমে আসে প্রায় ২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে, যা মে মাসের প্রায় ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এক মাসের এই পতন দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা না হলেও এটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
এদিকে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানি প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানি আয়ের বড় অংশ এসেছে তৈরী পোশাক খাত থেকে। অন্যান্য রফতানি খাত বিশেষ করে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, হোম টেক্সটাইল এবং কৃষিপণ্যের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে একটি মাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের রফতানি কাঠামোকে ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখেছে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লেও বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ। শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নীতিগত জটিলতা, ব্যবসার উচ্চ ব্যয় এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও রফতানিতে চাপ সৃষ্টি করছে। এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। তিনি বলেন, বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা আনতে শুধু রফতানি বাড়ালেই হবে না, একই সাথে বৈধ পথে রেমিট্যান্সপ্রবাহ আরো বাড়াতে হবে এবং বিদেশে দক্ষকর্মী পাঠানোর ওপর জোর দিতে হবে। দক্ষ জনশক্তির চাহিদা যেসব দেশে বাড়ছে, সেসব দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তি সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের দাবি।
রফতানিকারকরা বলছেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে দ্রুত বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, কাস্টমস আধুনিকীকরণ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো জরুরি। একই সাথে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কসুবিধা কমে যাওয়ার শঙ্কা মাথায় রেখে এখন থেকেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির (পিটিএ) উদ্যোগ আরো জোরদার করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরী পোশাক খাত থেকে এবং এর সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এসব বাজারে মূল্যস্ফীতির প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে না পারায় ভোক্তারা এখনো ব্যয় কমাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন ক্রয়াদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। এর প্রভাব বাংলাদেশী পোশাক কারখানাগুলোর ওপরও পড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়াই নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কটের প্রভাব, উচ্চ সুদের হার, ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং লজিস্টিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক রফতানিকারক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। একই সময়ে ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো দ্রুত বাজার সম্প্রসারণে কাজ করছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় রেমিট্যান্স খাতেও উদ্বেগের কারণ রয়েছে। বাংলাদেশের মোট প্রবাসী আয়ের বড় অংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ থেকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজারে নতুন নিয়োগের গতি আগের তুলনায় কমেছে। পাশাপাশি কিছু দেশে স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর নীতির কারণে বিদেশী শ্রমিক নিয়োগে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে, যা বাংলাদেশী কর্মীদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানি ও রেমিট্যান্স দুই খাতই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস হওয়ায় এ দু’টি খাতে সামান্য ধীরগতিও আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই এখনই ঝুঁকি মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
এ দিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কার্যকর রাখা, রফতানিমুখী শিল্পে বিশেষ অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, নতুন রফতানি বাজার অনুসন্ধান, দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ বৃদ্ধি এবং বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের আরো উৎসাহিত করা। একই সাথে হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো এবং প্রবাসীদের জন্য ডিজিটাল রেমিট্যান্স সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে।
সরকার ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশ বাড়ানোর কৌশলও গ্রহণ করছে। পাশাপাশি তৈরী পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রকৌশল পণ্যের রফতানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। একই সাথে শ্রমবাজারেও নতুন গন্তব্য খোঁজার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশে দক্ষকর্মী পাঠানোর উদ্যোগ জোরদার করা হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, শুধু মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর না থেকে শ্রমবাজার বৈচিত্র্যময় করা গেলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সপ্রবাহ আরো টেকসই হবে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে সঙ্কট হিসেবে না দেখে সতর্কসঙ্কেত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, উৎপাদন ব্যয় কমানো, ব্যবসা সহজীকরণ, বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং প্রবাসীদের জন্য সহজ ও কম খরচে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বৈদেশিক খাতের ভিত্তি আরো শক্তিশালী হবে।
রফতানি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাহিদা পুনরুদ্ধার এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসা পর্যন্ত বাংলাদেশকে নতুন বাজার, নতুন পণ্য ও নতুন কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরতা বাড়াতেই হবে। অন্যথায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর চাপ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।



